স্পোর্টস ডেস্ক
১১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৩ পিএম
কর্পোরেট দুনিয়ায় সফল এক নারী, যিনি টেলিকম ও আইটি খাতে নিজের দক্ষতা দিয়ে পরিচিত। হঠাৎ একদিন তাঁর নাম চলে এলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবির পরিচালক পদে। গত বছর নভেম্বরের শুরুতে এই ঘোষণার পর চারপাশে উঠল তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। অনেকেই প্রশ্ন তুললেন কেন কর্পোরেট থেকে সরাসরি ক্রিকেট বোর্ডে? কীভাবে এই সিদ্ধান্ত হলো? সম্প্রতি সেই রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ফেসবুকে এক পোস্টে পুরো ঘটনার ভেতরের গল্প তুলে ধরেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের লেখ তুলে ধরা হলো, ‘বিসিবি নির্বাচন প্রক্রিয়াটা যে সময় চলে তার প্রায় পুরোটা সময় আমেরিকা ছিলাম। আমার তাই পরিষ্কারভাবে জানা নেই সেসময় কী হয়েছে। জানার প্রয়োজনও ছিল না। সরকারে যে ক'দিন কাজ করেছি, নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বের বাইরে কোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাইনি। বিসিবি নিয়ে তো নয়ই। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার সম্ভবত পরদিন গভীর রাতে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফোন করলেন। বললেন, সরকার মনোনীত একজন পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচিত পরিচালকদের সবাই পুরুষ। তারা তাই অনুধাবন করছেন, এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে একজন নারীকে মনোনয়ন দেওয়া প্রয়োজন। পরদিন দুপুরে পরিচালনা পরিষদের প্রথম সভা। এর আগেই মনোনয়নের কাজটি তারা সারতে চান।’
‘কিন্তু এত অল্প সময়ে উপযুক্ত একজনকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। পরিচিত দুই একজনের সাথে কথা বললাম। কয়েকটা নামও মাথায় এল। কিন্তু তারা কতটুকু কী করতে পারবেন, আমি নিজেই নিশ্চিত ছিলাম না। হঠাৎ করেই রুবাবা দৌলার নাম মনে আসে। ক্রীড়া উপদেষ্টাকে জানালাম। তিনি বিসিবি সভাপতি সহ আরো দুই-তিনজন পরিচালকের সাথে কথা বললেন। রুবাবা দৌলার যোগ্যতা এবং স্পোর্টস ও পারিবারিক ব্যাকগ্রাউণ্ড সম্পর্কে তারা সবাই অবহিত ছিলেন। সবাই একবাক্যে সায় দিলেন। কিন্তু আমরা সায় দিলেইতো হবে না। রুবাবা দৌলা নিজে এই কাজে সম্মত আছেন কি-না সেটা জানা প্রয়োজন। রাত তখন ১২টা পেরিয়ে গেছে। এত রাতে তাকে ফোন করা ঠিক হবে কি-না সেটা নিয়েও দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু তার সম্মতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তেও আসা সম্ভব নয়।’
‘ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কিত সার্চ কমিটির আহ্বায়ক জোবায়দুর রহমান রানার সঙ্গে কথা বললাম। তিনি রুবাবা দৌলার সঙ্গে আগে ব্যাডমিনটন ফেডারেশনে কাজ করেছেন। এছাড়া এবার তাকে আমরা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি হিসেবে চিন্তা করেছিলাম। স্বাভাবিক কারণেই রানা ভাইয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। আমাদের চিন্তাভাবনা করতে করতেই রাত ১টা বেজে যায়। আমি তাই প্রথমে তাকে ফোন দেইনি। রুবাবা দৌলাকে রানা ভাই ফোন দিয়ে জানালেন, খুবই জরুরি বিষয়ে সরকার থেকে উনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’
‘উনি কথা বলতে রাজি হলেন। তারপর আমি ফোন দিয়ে বিস্তারিত জানলাম। তিনি সকাল অবধি সময় চাইলেন। জানালেন, যে করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তাদের অনুমতি প্রয়োজন। আমাদের অপেক্ষা করতে অসুবিধে ছিল না। খুব সকালে তাকে আবার ফোন দিলাম। কিন্তু তার অনুমতি আসে নাই। বিসিবির প্রথম সভাটা তার পদটি শূন্য রেখেই হয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে খবরটা মিডিয়ায় চলে আসে। সাইবার স্পেসে এরপর তাকে যেভাবে অ্যাটাক করা হয়, সেটা ছিল অবর্ণনীয়। সরকার থেকে তখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় আরো কয়েকজন তদবির শুরু করেন। আমার একটা আশঙ্কা ছিল, তদবিরের কারণে সিদ্ধান্ত বদলে যায় কি-না? কিন্তু ক্রীড়া উপদেষ্টা জানালেন, সেককম কোনো সুযোগ নাই।’
‘দ্বিতীয় সভার ঠিক আগে রুবাবা দৌলার প্রতিষ্ঠান সম্মতি জানালে সরকার তার নাম ঘোষণা করে। তত দিনে হাজারো সাইবার বুলিংয়ের কারণে তিনি নিজেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তার প্রতিষ্ঠান ওরাকল অবধি বিষয়টা চলে যায়। তারাও কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে। তবে রুবাবা দৌলা সাহসী নারী। তিনি জানেন কীভাবে প্রতিকূলতাকে জয় করতে হয়। সব উপেক্ষা করে তাই কাজে নেমে পড়েছিলেন। তার জায়গায় এখন বিসিবিতে এসেছেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। আমি কয়েকটা টকশোতে তার সহ আলোচক ছিলাম। তাকে বিচক্ষণ নারী হিসেবেই দেখেছি। আশা করবো সাইবার স্পেসে কেউ তাকে কোনো ধরনের আক্রমণ করবেন না। আমাদের রুবাবা দৌলা, রাশনা ইমাম সবাইকেই প্রয়োজন। সমাজে পিছিয়ে পড়া নারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা একটু এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের সবাইকে কাজে লাগাতে হবে।’