স্পোর্টস ডেস্ক
০১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম
টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলো ইতালি। প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হৃদয়ভাঙা হারের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপ স্বপ্ন। এক সময় যাদের হাত ধরে ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে গিয়েছিল সেই ইতালির জন্য এটি এক কঠিন বাস্তবতা।
পাওলো মালদিনি, রবার্তো বাজ্জিও, জিয়ানলুইজি বুফন, আন্দ্রেয়া পিরলো, ফাবিও কানাভারো কিংবা আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর মতো কিংবদন্তিদের দেশ এখন ৭১তম র্যাঙ্কিংয়ের একটি দলের বিপক্ষে জিততে হিমশিম খাচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কীভাবে একটি দল ১২ বছর বিশ্বকাপের বাইরে থেকেও এর মাঝে ইউরো ২০২০ জিতে নেয়? অনেকের মতে, সেই শিরোপা আসলে এক ধরনের মরীচিকা ছিল, যা ইতালির আসল সমস্যাগুলো আড়াল করেছিল।
একসময় ইতালি নিয়মিত বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করত। কিন্তু এখন সেই ধারা প্রায় থমকে গেছে। সেরি আ ক্লাবগুলো তরুণদের সুযোগ দেওয়ার বদলে অভিজ্ঞ বিদেশি বা স্বল্পমূল্যের খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করছে। ফলে স্থানীয় তরুণরা পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে না বড় মঞ্চের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা।
এছাড়া অবকাঠামোগত দিক থেকেও পিছিয়ে আছে ইতালি। প্রিমিয়ার লিগ বা বুন্দেসলিগার মতো আধুনিক স্টেডিয়াম মালিকানা ও উন্নয়নের সুযোগ না থাকায় ক্লাবগুলোর আয় কম, যার প্রভাব পড়ছে একাডেমি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।
ইতালি তাদের ঐতিহ্যবাহী রক্ষণভিত্তিক খেলার ধারা থেকে বের হতে চাইলেও আধুনিক আক্রমণাত্মক ফুটবলে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। ফলে মাঠে তাদের খেলার ধরনে স্পষ্ট কোনো পরিচয় দেখা যায় না। ছোট দলগুলোর বিপক্ষে রক্ষণ ভাঙতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে তারা। বাছাইপর্বে নরওয়ের থেকে ৬ পয়েন্ট পিছিয়ে পড়া তারই প্রমাণ।
দল নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কোচদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা অনেক সময় পুরনো, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছেন, যাদের গতি ও ফিটনেস আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক দলগুলোতেও একক কোনো ফুটবল দর্শন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে ফেডারেশন।
এছাড়া অর্থনৈতিকভাবেও বেশ পিছিয়ে আছে ইতালির ফুটবল। ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের তুলনায় সেরি আ-এর অর্থনৈতিক শক্তি অনেক পিছিয়ে। টিভি স্বত্ব ও বাণিজ্যিক আয়ে পিছিয়ে থাকায় ইতালিয়ান ক্লাবগুলো নিজেদের সেরা তরুণদের ধরে রাখতে পারছে না, তারা অল্প বয়সেই বিদেশে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বিদেশি খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ধীরে ধীরে “ইতালিয়ান ফুটবল স্টাইল”কেই দুর্বল করে দিচ্ছে। এর ফলে জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পজিশনে, বিশেষ করে স্ট্রাইকার- মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের ঘাটতি স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে, ইতালির এই ব্যর্থতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ভুল নীতি এবং পরিকল্পনার অভাবের ফল- যা থেকে বের হতে না পারলে তাদের বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফেরাটা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।