বিজ্ঞান ডেস্ক
২৭ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
আধুনিক তাপগতিবিদ্যার (Thermodynamics) আলোকে জ্বালানির দহন ক্ষমতা বলতে মূলত এর রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে রূপান্তর করার সক্ষমতাকে বোঝায়। অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনে (Internal Combustion Engine) জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, পেট্রোল এবং অকটেন বহুল ব্যবহৃত। এদের প্রত্যেকের আণবিক গঠন, হাইড্রোকার্বন চেইনের দৈর্ঘ্য এবং দহন প্রক্রিয়া ভিন্ন হওয়ার কারণে এদের শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা এবং ইঞ্জিনের ওপর প্রভাবও ভিন্ন হয়।
১. ক্যালোরিফিক মান: শক্তির পরিমাপকবিজ্ঞানের ভাষায় দহন ক্ষমতার প্রধান মানদণ্ড হলো তাপন মূল্য বা ক্যালোরিফিক মান (Calorific Value)। এটি নির্দেশ করে প্রতি একক ভরের জ্বালানি সম্পূর্ণ দহনের ফলে কতটুকু তাপ উৎপন্ন হয়।
ডিজেলের শ্রেষ্ঠত্ব: ডিজেলের আণবিক গঠন দীর্ঘ এবং এটি পেট্রোল বা অকটেনের চেয়ে ঘন। ফলে এর শক্তি ঘনত্ব (Energy Density) সবচেয়ে বেশি। প্রতি কেজি ডিজেলে প্রায় ৪৫.৫ মেগাজুল শক্তি থাকে।

পেট্রোল ও অকটেন: এদের আণবিক চেইন ছোট হওয়ায় এদের ক্যালোরিফিক মান ডিজেলের তুলনায় কিছুটা কম (প্রায় ৪৪.৪ - ৪৪.২ MJ/kg)। তবে এরা দ্রুত বাষ্পীভূত হতে পারে।
২. কমপ্রেশন রেশিও ও অটো-ইগনিশন
দহন ক্ষমতা কেবল তাপ উৎপন্ন করার ওপর নির্ভর করে না, বরং জ্বালানিটি কত উচ্চ চাপে দহনে অংশ নিতে পারে তার ওপরও নির্ভর করে।
ডিজেল (কমপ্রেশন ইগনিশন): ডিজেল ইঞ্জিনে কোনো স্পার্ক প্লাগ থাকে না। বাতাসকে অত্যন্ত উচ্চ চাপে সংকুচিত করে গরম করা হয় এবং তাতে ডিজেল স্প্রে করলে তা নিজে নিজেই জ্বলে ওঠে। উচ্চ চাপে দহন হওয়ার কারণে ডিজেল ইঞ্জিনের তাপীয় দক্ষতা (Thermal Efficiency) অন্যগুলোর চেয়ে বেশি।

পেট্রোল ও অকটেন (স্পার্ক ইগনিশন): এগুলো স্পার্ক প্লাগের বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গের মাধ্যমে জ্বলে। এদের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো অকটেন রেটিং। এটি জ্বালানির 'অকাল দহন' বা 'নকিং' (Knocking) রোধ করার ক্ষমতা নির্দেশ করে।
৩. অকটেন বনাম পেট্রোল: দহনের গুণগত বিশ্লেষণ
রাসায়নিকভাবে অকটেন ও পেট্রোল একই শ্রেণির (Gasoline) হলেও এদের পারফরম্যান্স ভিন্ন।

পেট্রোল: সাধারণ পেট্রোলে আইসো-অকটেনের পরিমাণ কম থাকে। ফলে উচ্চ চাপের ইঞ্জিনে এটি নির্ধারিত সময়ের আগেই জ্বলে ওঠে (Pre-ignition), যা ইঞ্জিনে অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ বা নকিং সৃষ্টি করে। এতে ইঞ্জিনের আয়ু কমে এবং শক্তির অপচয় হয়।
অকটেন: এতে আইসো-অকটেনের মাত্রা বেশি (সাধারণত ৯৫ বা তার বেশি) থাকায় এটি উচ্চ চাপ সহ্য করতে পারে এবং স্পার্ক দেওয়ার ঠিক মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বলে ওঠে। ফলে ইঞ্জিনের প্রতিটি ফোঁটা জ্বালানি থেকে সর্বোচ্চ শক্তি পাওয়া সম্ভব হয়।
৪. পরিবেশগত প্রভাব ও অবশিষ্টাংশ
দহন প্রক্রিয়ার উপজাত হিসেবে উৎপন্ন গ্যাসগুলোও বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
ডিজেল: উচ্চ শক্তি দিলেও ডিজেল দহনে বেশি পরিমাণ নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং সূক্ষ্ম কার্বন কণা (Soot) নির্গত হয়।
অকটেন ও পেট্রোল: এদের দহন প্রক্রিয়া তুলনামূলক পরিষ্কার। বিশেষ করে উচ্চ মানের অকটেন ইঞ্জিনে কার্বনের স্তর কম জমায়, যা পরিবেশ ও ইঞ্জিনের জন্য ভালো।

সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে-
১. শক্তির ঘনত্বের বিচারে: ডিজেলের দহন ক্ষমতা বা তাপ উৎপাদন ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। ভারী কাজের জন্য এটিই শ্রেষ্ঠ।
আরও পড়ুন: পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলে কেন রঙ মেশানো হয়?
২. সুনিয়ন্ত্রিত ও মসৃণ দহনের বিচারে: অকটেন সাধারণ পেট্রোলের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এটি ইঞ্জিনের নকিং রোধ করে সর্বোচ্চ আউটপুট নিশ্চিত করে।
অতএব, বিজ্ঞানসম্মতভাবে কোনোটিই এককভাবে শ্রেষ্ঠ নয়; বরং ইঞ্জিনের ধরন ও প্রয়োজনীয় কাজের ওপর ভিত্তি করে এদের উপযোগিতা নির্ধারিত হয়।
এজেড