নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
ভূমিকম্প প্রবণ বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে কয়েক সেকেন্ডের সতর্কতাই প্রাণ বাঁচাতে পারে, সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি একটি উদ্ভাবন নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি (ডিআইআইটি), ঢাকার কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম মোল্লা তৈরি করেছেন একটি ‘স্মার্ট আর্থকোয়েক আর্লি ওয়ার্নিং ডিভাইস’, যা ভূমিকম্পের ভয়াবহ কম্পন শুরু হওয়ার আগেই মানুষকে সতর্ক করতে সক্ষম।
আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুর দুইটায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক এএসএম আমানুল্লাহর হাতে ডিভাইসটি হস্তান্তর করে ইব্রাহিম মোল্লা তার বিস্ময়কর আবিষ্কারের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন।
ইব্রাহিম বলেন, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ ডাউকি, ইন্দো-বার্মা ও গ্রেট হিমালয়ান ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করায় যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতা জীবন রক্ষার অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে।
ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, উদ্ভাবিত ডিভাইসটি ভূমিকম্পের ধ্বংসাত্মক S-wave (এস-ওয়েভ) পৌঁছানোর আগেই অপেক্ষাকৃত দ্রুতগামী P-wave (পি-ওয়েভ) শনাক্ত করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগেই সাইরেন বা অ্যালার্ম বাজিয়ে মানুষকে সতর্ক করা যায়।
তার মতে, ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে ডিভাইসটি ভিন্ন ভিন্ন সময় আগে সতর্ক করতে পারে। ডাউকি ফল্ট (প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে) থেকে ভূমিকম্প শুরু হলে প্রায় ২০ সেকেন্ড আগে সতর্ক সংকেত পাওয়া যাবে। গ্রেট হিমালয়ান ফল্ট (প্রায় ৭৫৬ কিলোমিটার দূরে) থেকে কম্পন শুরু হলে ৯০ সেকেন্ড বা দেড় মিনিট আগে অ্যালার্ম বাজবে।
এই সময়ের মধ্যেই মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্ধ করতে কিংবা শিশু ও বয়স্কদের রক্ষা করতে পারে।
ডিভাইসটি তৈরি করা ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটির এই ছাত্র বলেন, ডিভাইসটির অন্যতম বড় সুবিধা হলো, এটি চালাতে কোনো ইন্টারনেট বা ওয়াইফাই প্রয়োজন হয় না। ফলে ভূমিকম্পের সময় নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হলেও ডিভাইসটি নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করবে। ডিভাইসটিতে ব্যবহৃত হয়েছে উন্নত AI-চালিত PhaseNet অ্যালগরিদম, যা সাধারণ যানবাহনের কম্পন, ভারী যন্ত্রপাতির নড়াচড়া এবং প্রকৃত ভূমিকম্পের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে পারে। ফলে ভুল অ্যালার্মের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদেশি বাজারে থাকা অনুরূপ ভূমিকম্প সতর্কীকরণ ডিভাইসের দাম ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেশি, সেখানে ইব্রাহিম মোল্লার তৈরি ডিভাইসটির সম্ভাব্য মূল্য মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা একটি সাধারণ টেবিল ফ্যানের চেয়েও সাশ্রয়ী।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী জানতে চাইলে ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, এই জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তিকে প্রতিটি ঘর, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালে পৌঁছে দিতে চাই। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে কয়েক সেকেন্ড সময় পেলে এই ডিভাইসটির কারণে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
উল্লেখ্য, ইব্রাহিম মোল্লা এর আগেও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (ডিএনসিআরপি) জন্য বহুল আলোচিত ‘বাজারদর অ্যাপ’ উদ্ভাবন করেন, যা বাংলাদেশ সরকারকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উপহার দেওয়া হয়েছিল।
ক.ম/