images

ইসলাম

আলহাজ উপাধির জন্য হজ করলে পরিণতি ভয়াবহ

ধর্ম ডেস্ক

০৯ জুন ২০২৩, ০৬:১৩ পিএম

হজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রোকন এবং একটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত, যা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আদায় করতে হবে। হাজি বা আলহাজ উপাধি পাওয়ার জন্য হজ করা কিংবা হজ আদায়ের পর এই উপাধির আশায় থাকা দুটোই রিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা ইবাদতের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা সব বিনষ্ট করে দেয়। 

রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে যতটা ভয় পাচ্ছি, অন্য কোনো বিষয়ে ততটা ভীত নই।’ সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ছোট শিরক কী? রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, রিয়া বা প্রদর্শনপ্রিয়তা। আল্লাহ কেয়ামতের দিন বান্দার আমলের প্রতিদান প্রদানের সময় বলবেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে যাদের দেখাতে, তাদের কাছে যাও। দেখো তাদের কাছে তোমাদের কোনো প্রতিদান আছে কি না?’ (মুসনাদে আহমদ: ২২৫২৮)

লোকে হাজি বলবে— এজন্য হজ করলে শুধু যে ইবাদত নষ্ট হবে তা নয়, পাপী হিসেবেও তার নাম লেখা হবে। এজন্যই যেকোনো ইবাদতের আগে নিয়ত ও উদ্দেশ্য ঠিক করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে আমাদের এই দোয়া শিখিয়েছেন- নিঃসন্দেহে আমার সালাত, আমার হজ আমার জীবন ও মরণ সবকিছু জগতসমূহের পালনকর্তা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য। (সুরা আনআম: ১৬২)
 
হজের লক্ষ্য হবে আল্লাহমুখী হওয়া। হজব্রত পালনকারী ব্যক্তি তার হজ শুরু করেন তালবিয়ার মাধ্যমে। লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক..। ‘আমি হাজির হে আল্লাহ আমি আপনার দরবারে হাজির।’ অর্থাৎ সব কিছু ত্যাগ করে আমি আপনাকে চাই। আপনার সন্তুষ্টিই আমার একমাত্র লক্ষ্য। কাজেই এই তালবিয়া পাঠের পর কোনো হাজি তার হজ দ্বারা পার্থিব সুনামকে নিজের লক্ষ্য বানাতে পারে না। শয়তান বান্দার আমল নষ্ট করার জন্য সবসময় ওঁত পেতে থাকে। হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হওয়ায় শয়তান হজ আদায়কারীর নিয়ত নষ্ট করতে তৎপর হয়। এজন্যই রাসুল (স.) হজকে রিয়ামুক্ত করার জন্য এই দোয়া পাঠ করেছেন- اللَّهُمَّ اجْعَلْهَا حَجَّةً غَيْرَ رِيَاءٍ وَلاَ مُهابَةٍ وَلاَ سُمْعَةٍ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি এটাকে এমন হজে পরিণত করুন, যাতে (আপনার উদ্দেশ্য ছাড়া) কোনো রকম ‘রিয়া’ (প্রদর্শনী), প্রতিপত্তি ও সুনামের উদ্দেশ্য না থাকে।’ (বায়হাকি, আস সুনান: ৪/৩৩২, ৩৩৩)
 
প্রিয়নবীর হজের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল। তবু তিনি এ প্রার্থনা করলেন কেন? আমাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং সতর্ক করার জন্য। 

অথচ নামের শুরুতে হাজি বা আলহাজ যোগ না করলে ইদানীং অনেকে রাগ করেন। আলহাজ লকব দিয়ে পোস্টার ছাপান। কিন্তু প্রিয়নবীর সাহাবিরা নবীজির সঙ্গে হজ করেছেন। তাদের কারও নামের সাথেই হাজি বিশেষণ যোগ করা হয় না। হাজি আবু বকর, হাজি ওমর, হাজি উসমান, হাজি আলি বলা হয় না। তাতে কি তাদের মান মর্যাদা কমে গেছে? না, মোটেও না।
 
ইমাম আবু হানিফা পঞ্চাশ বারের অধিক হজ করেছেন তাকেও হাজি আবু হানিফা বলা হয় না। এতে তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়নি। দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে কত অসংখ্য মনীষী হজ করেছেন তাদের কারও নামের শুরুতেই এই বিশেষণ যোগ করা হয়নি। কারণ, আল্লাহর ফরজ করা ইবাদত পালন করলে সেটি প্রকাশ করা নিষ্প্রয়োজন এবং ক্ষতিকর। নামাজ ও রোজা তো হজের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কেউ কি নামাজের কারণে নিজের নামের আগে আল-মুসল্লি বা রোজা রাখার কারণে আস-সায়েম লকব দেন? দেন না। কারণ আল্লাহর ফরজ ইবাদত পালন করতেই হবে এবং ইবাদতের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। অন্যকোনো উদ্দেশ্য থাকলে সেই ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না। 

পরকালে লোকদেখানো ইবাদত ব্যক্তির জন্য বোঝা ও আক্ষেপের কারণ হবে। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) কেয়ামতের দিন লোক-দেখানো আমলকারীদের বিচারের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন, যাতে একজন শহীদ (আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী), একজন কোরআনের শিক্ষক ও একজন দানবীরের আলোচনা এসেছে। যারা খ্যাতি ও সুনামের মোহে জিহাদ, কোরআন শিক্ষা ও দান করত। তারা তাদের আমলের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তাদের বলেন, ‘তোমরা যা চেয়েছ পৃথিবীতে তা পেয়েছ। সুতরাং আজ আমার কাছে তোমাদের কোনো প্রাপ্য নেই।’ (সহিহ মুসলিম: ৩৫২৭)

জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে শোনানোর জন্য এবং মানুষের নিকট প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য কোনো আমল করে— আল্লাহ তাআলা তার অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাকে রিয়াকারীর শাস্তি দেবেন। (বুখারি: ২/৯৬২; মুসলিম: ২/৪১২; তিরমিজি: ২/৬১; ইবনে মাজাহ: ২/৩১০; মুসনাদে আহমদ: ৩/৪০; শুয়াবুল ঈমান: ৫/৩৩০)

হাদিসে মর্মার্থ হলো- কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের সামনে তার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে— তাকে অপমান ও অপদস্থ করবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজসহ সকল ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। রিয়া থেকে হেফাজত করুন। আমিন।