ধর্ম ডেস্ক
১৬ মার্চ ২০২৩, ০১:০৫ পিএম
রমজানের রোজা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ। শরিয়তসম্মত বিশেষ কোনো ওজর ছাড়া রোজা না রাখা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা মারাত্মক গুনাহের কাজ। রোজা ভঙ্গের বিভিন্ন কারণের মধ্যে ইচ্ছাকৃত পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস অন্যতম। বিশেষ করে রমজানে দিনের বেলা রোজা অবস্থায় সহবাসে লিপ্ত হলে তার দণ্ড বা বিধান অত্যন্ত কঠোর।
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, রমজানের রোজা রেখে দিনের বেলা যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাসে লিপ্ত হয়, তবে বীর্যপাত হোক বা না হোক- স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের ওপর ‘কাজা’ ও ‘কাফফারা’ উভয়ই ওয়াজিব হয়। অর্থাৎ, ভাঙা রোজার পরিবর্তে পরবর্তীতে একটি রোজা রাখতে হবে (কাজা) এবং এর পাশাপাশি গুনাহের দণ্ড হিসেবে নির্ধারিত কাফফারা আদায় করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিকট এক ব্যক্তি এসে রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করার কথা জানালে তিনি তাকে কাফফারা আদায়ের নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ৬৭০৯; তিরমিজি: ৭২৪)
আরও পড়ুন: রমজানের রাতে সহবাস: সাহরি ও গোসলের বিধান
সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভাঙলে কাফফারা আদায়ের তিনটি ধারাবাহিক স্তর রয়েছে, তবে বর্তমান সময়ে প্রচলিত নিয়মগুলো হলো-
১. লাগাতার ৬০টি রোজা রাখা: কাফফারা হিসেবে বিরতিহীনভাবে টানা ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে। এই ৬০ দিনের মাঝখানে যদি একদিনও রোজা বাদ যায়, তবে পূর্বের রোজাগুলো বাতিল হয়ে যাবে এবং পুনরায় ১ থেকে গণনা শুরু করতে হবে। (মাবসুতে সারাখসি: ৩/৮২)। তবে নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময়টুকু এই বিরতির আওতায় পড়বে না; পবিত্র হওয়ার পর পুনরায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করে রোজা পূর্ণ করতে হবে।
২. বিকল্প (খানা খাওয়ানো): যদি কেউ বার্ধক্য বা এমন কোনো কারণে টানা ৬০টি রোজা রাখতে শারীরিকভাবে অক্ষম হন, তিনি ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খানা খাওয়াবেন। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৫১৩)।
৩. অর্থ বা খাদ্য দান: ৬০ জন মিসকিনকে খানা খাওয়ানোর পরিবর্তে প্রত্যেককে এক ফিতরা পরিমাণ (প্রায় ১ কেজি ৬৩৫ গ্রাম বা তার বেশি) গম বা তার সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া যেতে পারে। একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে প্রতিদিন এক ফিতরা পরিমাণ করে ৬০ দিন দিলেও কাফফারা আদায় হবে। তবে শর্ত হলো, ৬০ দিনের ফিতরার টাকা একত্রে বা এক দিনে এক ব্যক্তিকে দিলে কাফফারা আদায় হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ৩/৪৭৮)
আরও পড়ুন: রোজার দিনে স্ত্রীর সঙ্গে যা যা করা জায়েজ
যদি কোনো ব্যক্তি একই রমজানে একাধিকবার সহবাসের মাধ্যমে বা পানাহারের মাধ্যমে রোজা ভাঙে, তবে তার জন্য একটি কাফফারাই (৬০ রোজা) যথেষ্ট হবে। তবে যতটি রোজা ভেঙেছে, প্রতিটি রোজার জন্যই আলাদাভাবে একটি করে ‘কাজা’ আদায় করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ২/১০১)
কাফফারার রোজা রাখার সময় বছরের যে পাঁচ দিন রোজা রাখা হারাম (দুই ঈদ ও আইয়ামে তাশরিক), সেই দিনগুলোতে রোজা রাখা যাবে না। কাফফারা আদায়ের নিয়ত করার সময় এই দিনগুলোর হিসাব মাথায় রাখা জরুরি।
কাফফারার অর্থ বা খাবার কেবল তাদেরকেই দেওয়া যাবে, যাদের জাকাত প্রদান করা যায়। যেমন: ফকির, মিসকিন, নওমুসলিম, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিঃস্ব মুসাফির। (সুরা তওবা: ৬০)
ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গের ক্ষতি কেবল কাফফারা দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভাঙে, তার ওই রোজার বিপরীতে সারা জীবনের রোজাও রমজানের একটি রোজার সমমর্যাদা পাবে না।’ (তিরমিজি: ৭২৩)
রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। দিনের বেলা সহবাস বা পানাহারের মাধ্যমে রোজার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা আল্লাহর হুকুমের অবমাননা। তাই ভুলবশত এমনটি হয়ে গেলে দ্রুত তওবা করা এবং শরিয়ত নির্ধারিত নিয়মে কাজা ও কাফফারা আদায় করে নেওয়া জরুরি।