images

ইসলাম

ইসলামে বিজয় উদযাপনের রীতি

ধর্ম ডেস্ক

১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:০২ এএম

বিজয় ও স্বাধীনতা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। স্বাধীনসত্তা দিয়েই আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। বিস্তীর্ণ পৃথিবীজুড়ে মানবজাতির পিতা আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-এর স্বাধীন বিচরণ ছিল। তখন সীমানা চিহ্ন বলতে কিছু ছিল না। পরবর্তীকালে তাদের সন্তানরা ও বংশ পরম্পরায় নতুন প্রজন্ম পারস্পরিক স্বার্থপরতার পথ ধরে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

কোনো জাতির নির্দিষ্ট অংশ যখন অন্য অংশের দ্বারা নির্যাতিত হয়, নিজেদের অধিকার হারাতে বসে এবং বঞ্চিত ও শোষিত হয়, তখন শোষণকারীদের বিরুদ্ধে তারা বাধ্য হয়ে রুখে দাঁড়ায়। নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে যুদ্ধ-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর বিজয়ের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনে স্বাধীনতা। ঠিক একই অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শোষকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে আপামর জনতা জেগে ওঠেছিল। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল বিজয়ের রক্তিম সূর্য।

বিজয়ের দিন ও আমাদের করণীয়
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয়ের দিন। এ দিনেই জন্ম হয়েছিল আমাদের স্বাধীন সত্তার, স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের।  এ দিনেই আমরা পরিত্রাণ পেয়েছিলাম পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে। তাই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের শৌর্য ও বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় দিন। স্বাধীনতার জন্য এ দেশের অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে। মা-বোনরা সম্ভ্রম হারিয়েছে। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। সেই অগণিত মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসলই হলো এই বিজয়। আজ ১৯৭১ সালের সেই দিনটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যেদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে রওনা হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য দেখার জন্য। সেদিন সব ঘরবাড়ি, দালানকোঠার শীর্ষদেশে শোভা পাচ্ছিল স্বাধীন বাংলার রক্ত-রঙিন পতাকা।

এত কষ্টার্জিত বিজয়ের দিনে জাতি বিজয়ানন্দে আনন্দিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলমান হিসেবে আমাদের এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে আমাদের আইডল বা আদর্শ হলো বিশ্বমানবতার মূর্তপ্রতীক, মুক্তির দিশারি, সফল রাষ্ট্রনায়ক, মহান নেতা বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.)। আমরা যা কিছু করব, নবীজির আদর্শেই করব। বিজাতীয় সংস্কৃতি আমরা গ্রহণ করব না। কেননা প্রত্যেক বিষয়ে নবীজির সুন্নত রয়েছে। আর সুন্নতের অনুসরণেই রয়েছে পরকালীন মুক্তির নিশ্চয়তা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)

মক্কা বিজয়ের পর নবীজির আচরণ
ইসলামের ইতিহাসে যুগান্তকারী এক বিজয়ের নাম মক্কা বিজয়। অষ্টম হিজরির রমজান মাসে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ১১ বা ১৩ জানুয়ারি মহানবী (স.)-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের হাতে মক্কা বিজয় হয়। এটি এমন ঘটনা, যে ঘটনার পর পুরো আরব জাহানে এবং সারা বিশ্বে অল্পদিনের মধ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন মহানবী (স.) মক্কাবাসীদের সম্বোধন করে বললেন- হে কোরাইশ সম্প্রদায়! আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করব বলে তোমাদের ধারণা? তারা বলল, আপনি আমাদের মহান ভাই, মহান ভাইয়ের ছেলে। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের তাই বলব, যা ইউসুফ (আ.) তার ভাইদের বলেছিলেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও তোমরা আজ মুক্ত।’ (তাফসিরে কাশশাফ: ৬/৪৫১)

নবীজির (স.) এই অপূর্ব করুণা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত মক্কাবাসী অভিভূত হয়ে পড়ে। সজল নয়নে নির্বাক তাকিয়ে থাকে মহামানবের মুখের দিকে। এমনও কি হতে পারে? জীবনভর যাঁর সঙ্গে শত্রুতা করেছি, চিরতরে শেষ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছি, তিনিই আজ এই বদান্যতা, করুণা ও কোমলতা দেখালেন? তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নবীজি (স.)-এর চরণতলে নিজেদের সঁপে দেয়। তারা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’

মক্কাবাসীর চোখ থেকে মিথ্যার আবরণ খসে পড়ে এবং ইসলামের সঙ্গে নতুন দিনের যাত্রা শুরু করতে আগ্রহী হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের থেকে আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করেন। মূলত এ বাইয়াত ছিল নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। পবিত্র কোরআনে বিবৃত অঙ্গীকারে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বিষয়ক অপরাধগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যা একটি নতুন বিজিত ও স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহাসিকরা বলেন, মক্কায় মুসলিম বাহিনীর বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর মক্কার অধিবাসীদের সামনে সত্য পরিষ্কার হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল ইসলাম ছাড়া সাফল্যের কোনো পথ নেই। ফলে তারা বাইয়াতের জন্য একত্র হলো। মহানবী (স.) সাফার ওপর বসলেন এবং লোকদের বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন। ওমর (রা.) তাঁর নিচে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষ থেকে যথাসম্ভব আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। পুরুষদের অঙ্গীকার গ্রহণের পর নারীদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। ওমর (রা.) রাসুল (স.) থেকে একটু নিচু স্থানে বসে তাঁর নির্দেশে বাইআত করাচ্ছিলেন এবং নারীদের কথা তাঁর কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। (আর রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা-৪২৫)

বিজয় উদযাপনে ইসলামি রীতি
বিজয়ের আনন্দ আল্লাহর শুকরিয়া, আল্লাহর পবিত্রতা, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা করা ও নফল নামাজের মাধ্যমেই উদযাপন করার শিক্ষা দেয় ইসলাম। কেননা বিজয় আল্লাহর দান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ (সুরা ফাতহ: ১)

বিজয়ীদের কাজ কী—সে সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(তারা) যাদের আমি পৃথিবীতে বিজয়, সফলতা ও প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে এবং সৎকাজে আদেশ দান করে ও মন্দকাজে বাধা প্রদান করে। সকল কর্মের পরিণতি আল্লাহরই নিকটে।’ (সুরা হজ: ৪১)

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন; তিনি তো তওবা কবুলকারী।’ (সুরা নাসর: ১-৩)

বিজয়ের দিনের আরেকটি বিশেষ করণীয় হলো—৮ রাকাত নফল নামাজ পড়া। কারণ নবী (স.) মক্কা বিজয়ের দিন শুকরিয়াস্বরূপ আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছিলেন। (জাদুল মাআদ, ২য় খণ্ড)

আল্লাহ তাআলা আমাদের স্বাধীনতাকে চিরস্থায়ী করুন। আমাদেরকে স্বাধীনতা রক্ষা করার অদম্য চেতনা, দৃঢ়তা ও শক্তি দান করুন। এই বিজয়কে পরকালীন মুক্তির সিঁড়ি হিসেবে কবুল করুন। আমিন।