images

ইসলাম

কোরআন-হাদিসে অমুসলিমদের প্রতি উদারতা ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ

ধর্ম ডেস্ক

২১ অক্টোবর ২০২২, ০৫:২৮ পিএম

সৃষ্টিগতভাবে সব মানুষই এক। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সৃষ্টি করেছেন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) থেকে। সর্বোপরি তিনি মানুষকে সব সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করেছেন। তাই ইসলাম সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুমিনদের ওপর অমুসলিমদের অগ্রাধিকার দিতে নিষেধ করলেও তাদের প্রতি সদাচার, মানবিক সহযোগিতা, উদারতা ও ন্যায়বিচার করতে নিষেধ করেনি, বরং উদ্বুদ্ধ করেছে। 

মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে মহানবী (স.) সেখানে সাহায্য প্রেরণ করেন। অথচ এরাই অমানুষিক অত্যাচার ও নিপীড়ন করে মুসলমানদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। ওমর (রা.) মুসলমানদের মতো অমুসলিম দরিদ্রদেরও বায়তুল মাল থেকে সহযোগিতা দিতেন। কোরআন মাজিদে মুসলমানদের প্রতি এরূপই নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধরত নয় এবং মাতৃভূমি থেকে তোমাদের বহিষ্কার করেনি তাদের মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা মুমতাহিনা: ৮)

মুসলমানের প্রতি শত্রুসুলভ আচরণ না করলে ইসলাম অমুসলিম আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পরামর্শ দেয়। আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন, আমার মা, যিনি মুশরিক ছিলেন, তাঁর পিতার সঙ্গে আমার কাছে এলেন, যখন আল্লাহর রাসুল (স.)-এর সঙ্গে কোরাইশরা চুক্তি করেছিল। তখন আসমা (রা.) আল্লাহর রাসুল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার মা আমার কাছে এসেছেন। তিনি ইসলামের প্রতি আগ্রহী নন। আমি কি তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব? আল্লাহর রাসুল (স.) বললেন, হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। (সহিহ বুখারি: ৩১৮৩)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওজি (রহ.) বলেন, মা-বাবা অন্য ধর্মের অনুসারী হলেও তাদের ভরণ-পোষণ সন্তানের জন্য আবশ্যক। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার মা-বাবা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে বসবাস করো সৎভাবে।’ আর প্রয়োজন ও অসহায়ত্বের অবস্থার মধ্যে ছেড়ে যাওয়া অবশ্যই সদাচার হিসেবে গণ্য হতে পারে না। (সুরা লোকমান: ১৫; আহকামু আহলিজ জিম্মাহ: ২/৭৯২)

আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, মা-বাবার আনুগত্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও সদাচার শরিয়ত নিষিদ্ধ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ও ভালোবাসাকে আবশ্যক করে না। কেননা তা যারা মুসলমানের সঙ্গে শত্রুতায় লিপ্ত বা যারা লিপ্ত নয়, সবার ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ। (ফাতহুল বারি : ৫/২৩৩)

বলপ্রয়োগ করে কাউকে ইসলামে দীক্ষিত করা যাবে না। ইসলামের সৌন্দর্যে অনুপ্রাণিত হয়ে যুগে যুগে মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। কোনো ধরনের চাপ বা বল প্রয়োগ করে দীনে দীক্ষিত করার কোনো বিধান শরিয়তে নেই। আল্লাহ বলেন, ‘দীন সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই; সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে, যা কখনো ভাঙবে না। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা বাকারা: ২৫৬)

সবাই ধর্মীয় অধিকার পাবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। মুসলিম সমাজেও অমুসলিমরা নিজেদের পরিমণ্ডলে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করবে। অমুসলিমদের যেসব রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান ধর্ম পালনের অংশ, সেগুলোতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের দীন তোমাদের, আমার দীন আমার।’ (সুরা কাফিরুন: ৬)

জান-মালের নিরাপত্তার অধিকার সবাই ভোগ করবে। যেসব অমুসলিম মুসলিম দেশে রাষ্ট্রের আইন মেনে বসবাস করে অথবা ভিসা নিয়ে মুসলিম দেশে আসে, তাদের সুরক্ষা এবং জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধ ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারি: ২৯৯৫)

প্রতিবেশীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব ধর্মের মানুষ প্রতিবেশী হতে পারে। প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক প্রতিবেশী হিসেবে তাদের প্রতি সদয় আচরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনে কোনো প্রকার ত্রুটি করা যাবে না। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম অত্যন্ত তৎপর। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে অবিরত উপদেশ দিচ্ছিলেন, এমনকি আমি ধারণা করলাম যে, আল্লাহ তাদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।’ (বুখারি: ৫৬৬৮; মুসলিম: ৬৮৫৪)

এমনকি অসুস্থ অমুসলিমকে দেখতে যাওয়া সুন্নত। নবী (স.) অমুসলিম রোগীদের দেখতে যেতেন এবং তাদের ঈমানের দাওয়াত দিতেন। তাদের সেবা করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি নবী (স.)-এর খেদমত করত। সে অসুস্থ হলে নবী (স.) তাকে দেখতে গেলেন। তার মাথার দিকে বসে নবীজি বলেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। তখন সে তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা বলেন, তুমি আবুল কাসেমের (নবীর) অনুসরণ করো। ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (স.) এই বলে বের হলেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (বুখারি: ১২৯০)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মোতাবেত সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।