ধর্ম ডেস্ক
০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৪৯ পিএম
আজ ৫ অক্টোবর। বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনের সিদ্ধান্তে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রায় দুই শ দেশে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। ইসলামে শিক্ষক অনেক মর্যাদার অধিকারী। প্রিয়নবী (স.) বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৯) শিক্ষক দিবসের পরিপ্রেক্ষিতে হাদিসটি গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে ভূমিকা পালন করেন একজন শিক্ষক। কবি কাদের নেওয়াজের ভাষায়— ‘... শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার/দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার/ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল...।’
জাহেলি আরবের বিশাল ভূখণ্ডে শিক্ষিত লোক ছিলেন মাত্র ১৭ জন। এত কম সংখ্যক শিক্ষিত তৎকালীন সমাজ ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। মহান আল্লাহ সে অন্ধকার সমাজে সর্বপ্রথম নির্দেশ দিলেন, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে—যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন...তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক: ১-৫)
এ আয়াত থেকেই মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চা ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। শিক্ষকসহ জ্ঞানচর্চা ও প্রসারের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা জুমার: ৯)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যাকে জ্ঞান দান করা হয়েছে তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা,: ২৬৯)
এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে দোয়া শিখিয়েছেন, ‘রাব্বি জিদনি ইলমা’ ‘হে আমার প্রভু, আমার ইলম বৃদ্ধি করে দাও।’ (সুরা ত্বহা: ১১৪)
রাসুলুল্লাহ (স.) শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, ‘ইলমের অধিকারী ব্যক্তির জন্য সব কিছুই ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি সমুদ্রের মাছও।’(মুসনাদ আবু ইআলা: ২/২৬০)
বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ফকিহ সাহাবিদের মধ্যে সব থেকে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। কোরআনের তাফসিরের ক্ষেত্রে উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বিবেচনা করা হয় তাকে। এতো উঁচুমাপের ব্যক্তি হওয়ার পরেও তিনি বিজ্ঞজনের মর্যাদাদানে এতটাই সরল ছিলেন যে, হজরত জায়েদ বিন হারিসা আনসারী (রা.)-এর উটের লাগাম নিজ হাতে ধরতেন, এবং বলতেন, আমাদেরকে বিজ্ঞজনদের সাথে এমন আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। -(মুসতাদরাক হাকেম, ৩/২৩)
বর্ণিত আছে, ইমাম আহমদ রহ. ইসলামি জ্ঞান, তাকওয়া ও খোদাভীতির দিক দিয়ে তার শিক্ষকের তুলনায় অনেক অগ্রগামী ছিলেন, এরপরেও তিনি কখনো তাঁর শিক্ষকের সামনে বসতেন না, বরং বলতেন, আমাদের শিক্ষকের সামনাসামনি বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। (তাজকেরাতুস সামে ওয়াল মুতাকাল্লিম, ৭৮)
ইমাম শাফেয়ি (রহ) ইমাম মালেক (রহ)-এর অন্যতম শিষ্য ছিলেন। তিনি বলেন, আমি যখন ইমাম মালেক (রহ)-এর সামনে কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টাতাম, তখন অনেক ভদ্রতা ও বিনয়ের সাথে উল্টাতাম, খেয়াল রাখতাম যেন তিনি শব্দ পেয়ে কোনোভাবে বিরক্ত না হন। (হাওয়ালা সাবেক, ৮৮)
পবিত্র কোরআনে হজরত মুসা (আ.) ও হজরত খিজির (আ.)-এর ঘটনা সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত মুসা (আ.) একজন নবী হওয়ার পরও খিজির (আ.)-এর সব কথা ও আদেশ ধৈর্যসহকারে শুনেছিলেন, এ ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে মুসা (আ.) খিজির (আ.)-কে বললেন, আমি কি তোমার অনুসরণ করব এই মর্মে যে, তুমি আমাকে হেদায়েতের বাণী শেখাবে, যা তোমাকে শেখানো হয়েছে। (সুরা কাহাফ: ৬৬)
আল্লাহ তাআলা আলেমদের শান ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন এভাবে— আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন এবং ফেরেশতা ও জ্ঞানীরাও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। (সুরা আলে ইমরান: ১৮)
মহান স্রষ্টাকে চেনা, তাকওয়া অর্জন করার মূলে রয়েছে জ্ঞানার্জন। পবিত্র কোরআনে সে কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মহান প্রভু। ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে থাকে।’ (সুরা ফাতির: ২৮)
আরও ইরশাদ হয়েছে, যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন। (সুরা মুজাদালা: ১১)
সুতরাং জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য এবং পরস্পরনির্ভরশীল হওয়া জরুরি। একজনকে ছাড়া অন্যজনের অস্তিত্ব অর্থহীন। এই সম্পর্ক আত্মিক। দুজনের মধ্যে আত্মার সূত্রে আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরস্পরের পরিপূরক; তারা একে অপরকে পূর্ণ করে। শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষকের এমন সম্পর্কই হওয়া দরকার।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সহজ, সরল ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে উঠলেই সত্যিকার সেই শিক্ষক হয়ে ওঠা সম্ভব, সমাজে যিনি অন্য সবার চেয়ে বাড়তি মর্যাদার অধিকারী। উভয়ের মধ্যে এমন সম্পর্ক গড়ে উঠলেই শিক্ষার্থী ক্রমে বিদ্যার্থী হয়ে উঠবে এবং জাতি উপকৃত হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) নিজের ছাত্রদের সম্পর্কে বলেছেন, তাদের চেহারায় একটি মাছি বসলেও আমি কষ্ট পাই। (তাজকিরাতুস সামে, ৯)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে উভয় জাহানের উপকার তরান্বিত করতে শিক্ষকের মর্যাদা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসার, যত্ন নেওয়ার, উপকারী ইলম বিতরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।