ধর্ম ডেস্ক
০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কার আকাশ, মসজিদুল হারামের আঙিনা ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে বিচরণ করছে অসংখ্য কবুতর। নগরীর ঐতিহ্য ও জনজীবনের পরিচিত অংশ হয়ে ওঠা এসব পাখি হজযাত্রী ও দর্শনার্থীদের কাছেও পরিচিত দৃশ্য। মক্কার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের উপস্থিতি।
স্থানীয়ভাবে এসব কবুতর ‘হামাম আল-হিমা’ (হারামের কবুতর) এবং ‘হামাম রব্বিল বাইত’ (বাইতুল্লাহর প্রতিপালকের কবুতর) নামে পরিচিত। পবিত্র নগরীর শান্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় পাখিগুলো। তাদের উপস্থিতি মক্কার ঐতিহাসিক অতীতের সঙ্গে বর্তমান জনজীবনের এক যোগসূত্র তৈরি করেছে।
মক্কার ইতিহাসে এসব কবুতরের গুরুত্ব শুধু মসজিদুল হারামকেন্দ্রিক পরিচিত দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় বিধান, আইন ও স্থানীয় সংস্কৃতিতেও রয়েছে তাদের প্রসঙ্গ। পবিত্র হারাম এলাকার সীমানার মধ্যে বন্যপ্রাণী শিকারের ওপর ইসলামি বিধিনিষেধ রয়েছে। ঐতিহাসিক বিভিন্ন গ্রন্থেও এ বিষয়ে আলোচনা পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: মহাকাশ থেকে কাবার জ্যোতি: নভোচারীর চোখে বিস্ময়
মক্কার প্রাচীন ইতিহাসবিদ আবু আল-ওয়ালিদ আল-আজরাকি তার ‘আখবারু মক্কা’ গ্রন্থে হারাম এলাকার প্রাণীদের সুরক্ষায় ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিভিন্ন বিধান লিপিবদ্ধ করেছেন। আরেক ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ আল-ফাকিহি তার লেখায় এসব কবুতরকে ঘিরে সাহিত্য, কবিতা ও স্থানীয় রীতিনীতির নানা তথ্য তুলে ধরেছেন। এসব বিবরণে মক্কার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে কবুতরের দীর্ঘদিনের উপস্থিতির চিত্র পাওয়া যায়।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে মক্কায় কবুতরের ব্যাপক উপস্থিতির বিবরণ পাওয়া যায় পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তেও। ১৯১১ সালে প্রকাশিত মিসরীয় ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ আল-বাতনুনির ‘আর-রিহলাতুল হিজাজিয়্যাহ’ (হিজাজ ভ্রমণ) গ্রন্থে মসজিদুল হারামের আঙিনা, ছাদ ও খিলানযুক্ত প্রবেশপথে অসংখ্য কবুতরের বিচরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, মুসল্লিরা এসব পাখির জন্য খাবার ও পানি রাখার ব্যবস্থা করতেন। এতে কবুতরের প্রতি মানুষের যত্ন ও সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্য ফুটে ওঠে।
নগরীর পরিবেশের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে কবুতরগুলো এখনো মক্কার বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করছে। ভবনের কার্নিশ ও ছাদে তারা আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে খোলা চত্বর ও প্রশস্ত জায়গাগুলোতে তারা খাবার খোঁজে এবং বিচরণ করে।
আরও পড়ুন: মক্কার পবিত্র হারাম এলাকা: সীমানা ও প্রবেশের নিয়মাবলি
বিশেষ করে মসজিদুল হারামের আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গায় দলবেঁধে কবুতরের উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য হজযাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয়। অনেক দর্শনার্থীর কাছে পবিত্র নগরীর ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি আকাশজুড়ে কবুতরের উড়াউড়িও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। দর্শনার্থীদের তোলা ছবি ও ভ্রমণবৃত্তান্তেও প্রায়ই দেখা যায় এসব পাখির উপস্থিতি।
তবে কবুতরের সঙ্গে মানুষের এই দীর্ঘদিনের সহাবস্থান বজায় রাখতে জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাজ করছে মক্কা নগর কর্তৃপক্ষ। কবুতরের বিচরণস্থল হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন চত্বর ও চলাচলের পথ পরিষ্কার করা, পানি দিয়ে ধোয়া এবং পড়ে থাকা খাবার সরিয়ে নেওয়ার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এতে মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে।
প্রাচীন ইতিহাসবিদদের বিবরণ থেকে শুরু করে এক শতাব্দী আগের পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং বর্তমান হাজিদের ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য সবখানেই মক্কার কবুতরের উপস্থিতি চোখে পড়ে। পবিত্র নগরীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা এসব পাখি মক্কার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক স্বতন্ত্র যোগসূত্র হয়ে আছে।
সূত্র: আরব নিউজ