নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
আত্মশুদ্ধির মেহনত ছাড়া সমাজ সংস্কার সম্ভব নয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের অনাচার, দুর্নীতি, হত্যা ও অরাজকতা দূর করতে হলে মানুষের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনতে হবে। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিপূর্ণ গোলামি সম্ভব। সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম গ্রহণের আগে নানা গোনাহে লিপ্ত থাকলেও আত্মশুদ্ধির মেহনতে তারাই পরিণত হয়েছিলেন সোনার মানুষে। তাই সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে আত্মশুদ্ধির বিকল্প নেই।
আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী (পীর সাহেব বরুণা) এসব কথা বলেছেন।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অরাজনৈতিক ইসলাহি সংগঠন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ৮২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আজিমুশান ইসলাহি ইজতেমায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাদ ফজর শুরু হওয়া এ ইজতেমায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, আলেম-উলামা ও সংগঠনটির অনুসারীরা অংশ নেন।
ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের উদ্দেশে পীর সাহেব বরুণা বলেন, মানুষের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার প্রাচুর্য কিংবা বাহ্যিক উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঈমানের দৃঢ়তা, আমলের বিশুদ্ধতা, চরিত্রের সৌন্দর্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও প্রবৃত্তির টানে মানুষ অনেক সময় নিজের সংশোধনের কথা ভুলে যায়। ইবাদতে শৈথিল্য, আমল-আখলাকের দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অধিকার আদায়ে অবহেলা দীনি জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, উপকারী নসিহত গ্রহণ, দীনি পরিবেশের সাহচর্য ও আত্মশুদ্ধির নিয়মিত মেহনত।
তিনি বলেন, ১৯৪৪ সালে শায়খুল ইসলাম আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী (রহ.) আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে দীনি ও ইসলাহি মেহনতের সূচনা করেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষকে কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা, সুন্নতের অনুশীলন, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রতি আহ্বান জানানো। তাঁর রেখে যাওয়া এ ইসলাহি ধারার পরিচর্যা ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। এ মেহনত কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়; বরং ব্যক্তি ও সমাজের সংশোধনে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার নাম।
আঞ্জুমানের সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সংগঠন কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়, কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানোর এজেন্ডাও এর নেই। দলমত-নির্বিশেষে সব মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানানো এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে উদ্বুদ্ধ করাই এ সংগঠনের কাজ।

পরিবারে দীনি পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে পীর সাহেব বরুণা বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর একেকটি মাদরাসা হবে—এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিটি পরিবারে দীনি শিক্ষা ও তালিমের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট কোরআন তেলাওয়াত, দীনি বই পাঠ কিংবা প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। সন্তানদের বয়স অনুযায়ী কোরআন, নামাজ, ঈমান-আকিদা, মৌলিক ইবাদত ও ইসলামি আদব শেখাতে হবে। তাদের মক্তব বা উপযুক্ত দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
মসজিদের ইমামদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুমার খুতবার আগে মুসল্লিদের একটি করে ছোট সূরা শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সুরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে ৫২ সপ্তাহে অন্তত ১০টি সুরা সহিহভাবে শেখানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি জুমায় একটি করে জরুরি মাসয়ালা সহজ ভাষায় আলোচনা এবং প্রয়োজনে হাতে-কলমে তার সঠিক প্রয়োগ দেখিয়ে দিতে হবে।
ইজতেমায় বক্তব্য দেন আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর। তিনি বলেন, যারা নবীজি (সা.)-কে সর্বশেষ নবী হিসেবে মানে না, তারা কাফের। কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, ঈমানের সঙ্গে তাকওয়া জরুরি। আল্লাহকে ভয় করতে হবে, ফরজ ও ওয়াজিব আদায় করতে হবে এবং সব ধরনের গোনাহ পরিহার করে আখেরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, বর্তমানে এলজিবিটিকিউ ও ট্রান্সজেন্ডার বিষয়গুলো বিভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমাজে ছড়িয়ে দিতে নানা চক্রান্ত চলছে। যেকোনো মূল্যে এসব রুখে দিতে হবে।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন বলেন, ৯০ ভাগ মুসলমানের এ দেশে মুসলমানের সন্তানদের ঈমান ও আমলের হেফাজতে প্রাথমিক স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানদের ফরজে আইন পরিমাণ দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সংগঠনের প্রকৃত শক্তি শুধু পরিচিতি কিংবা বড় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মীদের ইখলাস, দায়িত্বশীলদের আমানতদারিতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আদর্শের প্রতি অবিচলতার মধ্যেই এর ভিত্তি নিহিত। প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে দ্বীনি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আদব ও দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করতে হবে।

আঞ্জুমানের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শেখ সাদ আহমদ আমীন বর্ণভী, মুফতি ওয়াজেদ আলী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আওলাদে রাসুল (সা.) সাইয়্যিদ ফয়সাল নাদীম, খেলাফত মজলিস মনোনীত সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, ওলামা-মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সভাপতি মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন, মাওলানা আকরাম আলী ফরিদপুর, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মুফতি শেখ আহমদ আফজল বর্ণভী, মুফতি ইমাদুদ্দীন ফরিদাবাদ, হাফেজ মাওলানা আলী আকবর কাসেমী, মুফতি আব্দুল লতীফ ফারুকী ও মুফতি সাইফুল ইসলাম ফারুকীসহ আঞ্জুমানের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা।
ইজতেমায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পীর সাহেব বরুণার ভক্ত-মুরিদরা বাস ও ট্রেনযোগে শুক্রবার ফজরের আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছান। শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, জিকির-আজকার ও রোনাজারিতে অংশ নিতে মুসল্লিদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণাতীতকালের অন্যতম বৃহৎ জুমার জামাত। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ লক্ষাধিক মুসল্লি এতে অংশ নেন।
আসরের পর পীর সাহেব বরুণার অশ্রুসিক্ত মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ইজতেমার কার্যক্রম শেষ হয়। মোনাজাতে তিনি দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর সার্বিক কল্যাণ কামনা করেন।
জেবি