ধর্ম ডেস্ক
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম
প্রতি জুমায় অনেক মুসলমান সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করেন। সুরাটি নাজিলের পেছনে একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। তাফসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজির (স.) নবুয়তের সত্যতা যাচাই করতে কুরাইশ নেতারা ইহুদি আলেমদের পরামর্শ নেন। তারা তিনটি প্রশ্ন করতে বলেন, গুহাবাসী যুবকদের ঘটনা, পূর্ব ও পশ্চিমে ভ্রমণকারী শাসক এবং রূহ সম্পর্কে। প্রথম দুই প্রশ্নের উত্তর সুরা কাহাফে এবং রূহের উত্তর সুরা বনি ইসরাইলের ৮৫ নম্বর আয়াতে নাজিল হয় বলে তাফসিরে উল্লেখ আছে।
সুরা কাহাফে চারটি ঘটনা রয়েছে, গুহাবাসী যুবক, দুই বাগানওয়ালা, মুসা (আ.) ও খিজিরের সফর এবং জুলকারনাইনের কাহিনি। আলেমদের অনেকে এসব ঘটনাকে ঈমান, সম্পদ, জ্ঞান ও ক্ষমতার চার ধরনের ফিতনার উদাহরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এটি তাফসিরকারদের পর্যবেক্ষণ, কোরআনে সরাসরি এভাবে বলা হয়নি। তবে প্রতিটি ঘটনার শিক্ষা আমাদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কয়েকজন যুবক এমন এক সমাজে বাস করতেন, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা হতো। তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের রব আসমান ও জমিনের রব।’ (সুরা কাহাফ: ১৪) এরপর ঈমান রক্ষার জন্য সবকিছু ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নিলেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল, আর আমি তাদের হেদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’ (সুরা কাহাফ: ১৩)
তারা দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকান্ড সঠিক করে দিন।’ (সুরা কাহাফ: ১০) আল্লাহ তাদের দীর্ঘ সময় ঘুমন্ত অবস্থায় রাখেন। কোরআনে এ সময়কাল ৩০০ বছর এবং আরও ৯ বছর বলা হয়েছে। (সুরা কাহাফ: ২৫)
শিক্ষা ও বাঁচার উপায়: পরিবার, সমাজ বা বন্ধুদের চাপের মুখেও ঈমান আঁকড়ে ধরতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষতিকর পরিবেশ থেকে সরে আসতে হবে এবং সৎ মানুষের সাহচর্য নিতে হবে। আল্লাহর সাহায্য মানুষের ধারণার বাইরের পথেও আসতে পারে।
দুই ব্যক্তির একজনকে আল্লাহ দুটি আঙুরের বাগান দিয়েছিলেন। সম্পদের অহংকারে সে বন্ধুকে বলল, ‘আমি তোমার চেয়ে সম্পদে বেশি এবং জনবলে শক্তিশালী।’ (সুরা কাহাফ: ৩৪) সে ভাবল, তার সম্পদ কখনো ধ্বংস হবে না। এমনকি কেয়ামত হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করল। (সুরা কাহাফ: ৩৫-৩৬)
তার ঈমানদার সঙ্গী তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘তুমি যখন নিজের বাগানে প্রবেশ করলে, তখন কেন বললে না, আল্লাহ যা চান তা-ই হয়? আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই।’ (সুরা কাহাফ: ৩৯) কিন্তু সে বন্ধুর উপদেশে কর্ণপাত করল না। পরিণতিতে তার বাগান ধ্বংস হলো। সে আফসোসে হাত কচলাতে লাগল। (সুরা কাহাফ: ৪২)
শিক্ষা ও বাঁচার উপায়: সম্পদ আল্লাহর দান, মানুষের কাছে তা আমানত। অর্থনৈতিক সাফল্য আধ্যাত্মিক সাফল্যের প্রমাণ নয়। নেয়ামত পেলে শুকরিয়া আদায় করতে হবে, অহংকার ও অপচয় এড়িয়ে চলতে হবে এবং সম্পদ সৎকাজে ব্যয় করতে হবে। পবিত্র কোরআন বলেছে, সম্পদ ও সন্তান দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য। তবে স্থায়ী সৎকর্মই রবের কাছে উত্তম প্রতিদান ও প্রত্যাশার বিষয়। (সুরা কাহাফ: ৪৬)
একবার মুসা (আ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী কে? তিনি বলেছিলেন, ‘আমি’। তখন আল্লাহ তাঁকে জানালেন, দুই সাগরের মিলনস্থলে তাঁর এক বান্দা আছেন, যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়েছে। এরপর মুসা (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সফরে বের হন। (সহিহ বুখারি: ১২২)
সফরে খিজির তিনটি কাজ করেন, যা বাহ্যিকভাবে আপত্তিকর মনে হয়েছিল। পরে তিনি সেগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করেন। (সুরা কাহাফ: ৭১-৮২)
নৌকায় ছিদ্র করা: নৌকাটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র মানুষের। সামনে ছিল এক অত্যাচারী রাজা, যে ভালো নৌকা জোর করে কেড়ে নিত। তাই নৌকায় ত্রুটি তৈরি করে সেটিকে রাজার হাত থেকে রক্ষা করা হয়।
বালককে হত্যা: বালকটির বাবা-মা ছিলেন মুমিন। আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান অনুযায়ী, বালকটি বড় হলে তার কারণে বাবা-মা অবাধ্যতা ও কুফরের কঠিন পরীক্ষায় পড়তেন। তাই আল্লাহ তাদের এমন সন্তান দিতে চেয়েছিলেন, যে পবিত্রতা ও দয়ার দিক থেকে উত্তম হবে।
প্রাচীর মেরামত: প্রাচীরের নিচে ছিল দুই এতিম শিশুর গুপ্তধন। তাদের বাবা ছিলেন সৎকর্মশীল। শিশুরা বড় হয়ে যেন নিজেদের সম্পদ উদ্ধার করতে পারে, সে জন্য প্রাচীরটি মেরামত করা হয়।
শিক্ষা ও বাঁচার উপায়: মানুষের জ্ঞানের সীমা আছে। নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী ভাবা এক ধরনের ফিতনা। কোনো ঘটনার পেছনের কারণ সব সময় আমাদের জানা থাকে না। তাই জ্ঞান অর্জনে বিনয়, ধৈর্য ও শিষ্টাচার জরুরি। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে জ্ঞানীদের কাছে জানতে হবে।
জুলকারনাইন ছিলেন এমন এক শাসক, যাকে আল্লাহ বিশাল ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়েছিলেন। (সুরা কাহাফ: ৮৪) তিনি পূর্ব ও পশ্চিমে সফর করেন। জালেমদের শাস্তি এবং নেককারদের সঙ্গে সদাচরণের নীতি ঘোষণা করেন। (সুরা কাহাফ: ৮৭-৮৮)
এক জাতি ইয়াজুজ-মাজুজের অনিষ্টের কথা জানিয়ে তাদের থেকে রক্ষার জন্য একটি প্রতিবন্ধক নির্মাণের অনুরোধ করে। বিনিময়ে তারা পারিশ্রমিক দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জুলকারনাইন তাদের কাছ থেকে অর্থ নিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার রব আমাকে যা দিয়েছেন, তা-ই উত্তম।’ এরপর তিনি তাদের শ্রম ও সহযোগিতা চান। লোহার পাত দিয়ে দুই পাহাড়ের মাঝের ফাঁক পূরণ করেন এবং তাতে গলিত তামা ঢেলে শক্ত প্রতিবন্ধক তৈরি করেন। (সুরা কাহাফ: ৯৫-৯৭)
এত বড় কাজের পরও তিনি অহংকার করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘এ আমার রবের অনুগ্রহ।’ (সুরা কাহাফ: ৯৮)
শিক্ষা ও বাঁচার উপায়: ক্ষমতা আল্লাহর দেওয়া আমানত। এর ব্যবহার হতে হবে মানুষের অধিকার রক্ষা, জুলুম প্রতিরোধ ও জনকল্যাণে। ক্ষমতা ও সাফল্য পেলে অহংকার করা যাবে না। সব অর্জনকে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
চারটি গল্পে চার ধরনের পরীক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। তবে সবগুলোর শিক্ষা এক জায়গায় এসে মেলে: আল্লাহর ওপর ভরসা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা। গুহার যুবকেরা দ্বীন রক্ষায় আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন। বাগানওয়ালা সম্পদের অহংকারে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। মুসা (আ.)-এর সফর মানুষের জ্ঞানের সীমা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর জুলকারনাইন ক্ষমতা পেয়েও বিনয়ী থেকেছেন।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে। (সহিহ মুসলিম: ৮০৯) অন্য বর্ণনায় শেষ দশ আয়াতের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর উজ্জ্বল থাকবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩৩৯২, মেশকাতুল মাসাবিহ: ২১৭৫)
সুরা কাহাফের ঘটনাগুলো ঈমান, সম্পদ, জ্ঞান ও ক্ষমতার নানা পরীক্ষায় সতর্ক থাকতে শেখায়। আর দাজ্জালের ফিতনা হবে ঈমানের জন্য ভয়াবহ পরীক্ষা। তাই জুমার দিন সুরাটি তেলাওয়াতের পাশাপাশি প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ রাখা, এর অর্থ ও শিক্ষা বোঝা এবং জীবনে অনুসরণ করার চেষ্টা করা উচিত।
তথ্যসূত্র: সুরা কাহাফ: ১০, ১৩-১৪, ২৫, ৩৪-৩৬, ৩৯, ৪২, ৪৬, ৭১-৯৮; সুরা বনি ইসরাইল: ৮৫; সহিহ বুখারি: ১২২; সহিহ মুসলিম: ৮০৯