Dhaka Mail Logo

ইসলাম

দুর্যোগের আগে কি বিশেষ আলামত দেখা যায়?

ধর্ম ডেস্ক

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রায়ই শোনা যায়, ঘটনার আগে প্রকৃতিতে অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কখনো আকাশের রঙ, কখনো ঝোড়ো বাতাস, আবার কখনো পশুপাখির আচরণ নিয়ে নানা দাবি ওঠে। কিন্তু এসব কি আসন্ন দুর্যোগের আলামত? কোরআন ও হাদিস এ বিষয়ে কী বলে?

ইসলাম প্রকৃতির পরিবর্তন থেকে শিক্ষা নিতে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করে। তবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো ঘটনাকে আসন্ন দুর্যোগের নিশ্চিত সংকেত মনে করার সুযোগ নেই।

প্রকৃতির পরিবর্তনে নবীজি (স.)-এর আচরণ

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আকাশে মেঘ বা ঝড়ো বাতাস দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চেহারায় উদ্বেগের ছাপ ফুটে উঠত। তিনি আল্লাহর কাছে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতেন। বৃষ্টি হলে তার উদ্বেগ দূর হতো। তিনি আশঙ্কা করতেন, এ মেঘের সঙ্গে এমন কোনো বিপর্যয় আসতে পারে কি না, যা অতীতে কোনো জাতির ওপর এসেছিল। (সহিহ মুসলিম: ৮৯৯)

আরও পড়ুন: দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতি এড়াতে নবীজির ৭ শিক্ষা

কোরআনে আদ জাতির ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা আকাশে মেঘ দেখে বৃষ্টির আশা করেছিল। অথচ সেই মেঘের সঙ্গে এসেছিল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আহকাফ: ২৪-২৫)

প্রাকৃতিক ঘটনাকে কুসংস্কারের সঙ্গে মেলানো যাবে না

নবীজি (স.)-এর ছেলে ইবরাহিমের ইন্তেকালের দিন সূর্যগ্রহণ হলে কিছু মানুষ তার মৃত্যুর সঙ্গে গ্রহণের সম্পর্ক জুড়ে দেয়। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) স্পষ্ট করেন, সূর্য ও চন্দ্র কারও জন্ম বা মৃত্যুর কারণে গ্রহণ হয় না। এগুলো আল্লাহর নিদর্শন। গ্রহণ দেখা দিলে তিনি নামাজ আদায় ও দোয়ার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ১০৪৩)

তাই আকাশের অস্বাভাবিক রঙ, পশুপাখির আচরণ কিংবা অন্যকোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখে নিশ্চিতভাবে বড় দুর্যোগ আসছে বলে প্রচার করা ঠিক নয়। গণক বা ভবিষ্যৎবক্তার মাধ্যমে অদৃশ্যের খবর জানার চেষ্টাও ইসলামে নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। (সহিহ মুসলিম: ২২৩০)

সব দুর্যোগের আগাম সংকেত কি জানা সম্ভব?

দুর্যোগের ধরন অনুযায়ী আগাম সতর্কসংকেত ভিন্ন হয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে ঘূর্ণিঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে আগে শনাক্ত করা সম্ভব। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, উপগ্রহের তথ্য এবং নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করে মানুষকে সতর্ক করা যায়।

অন্যদিকে, ভূমিকম্প ঠিক কখন, কোথায় এবং কত মাত্রায় হবে, তা নির্ভুলভাবে আগাম জানার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এখনো নেই। ছোট ছোট কম্পন বা প্রাণীর অস্বাভাবিক আচরণ দেখেই বড় ভূমিকম্প আসবে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

আরও পড়ুন: ভূমিকম্পে দোয়া মনে না এলে যে তিন শব্দ যথেষ্ট

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন... কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন ভূমিতে তার মৃত্যু হবে।’ (সুরা লুকমান: ৩৪)

মানুষের জ্ঞান সীমিত হলেও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তার মাধ্যমে অনেক বিপদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দুর্যোগ কি মানুষের পাপের কারণে আসে?

কোরআনে মানুষের কাজের সঙ্গে পৃথিবীর বিপর্যয়ের সম্পর্ক উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম: ৪১)

এ আয়াত মানুষকে অন্যায় থেকে ফিরে আসা, আত্মসমালোচনা ও তাওবার শিক্ষা দেয়। পরিবেশের ক্ষতি, অবিচার এবং দায়িত্বহীনতার পরিণতি নিয়েও চিন্তা করা প্রয়োজন।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়কে নিশ্চিতভাবে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর পাপের শাস্তি বলে ঘোষণা করা যায় না। কোরআনে বিপদ-আপদকে মানুষের পরীক্ষার বিষয় হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা বাকারা: ১৫৫) তাই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের দোষারোপ না করে তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।

দুর্যোগের আশঙ্কায় মুসলমানের করণীয়

ইসলামে আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকা নয়। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সময়ে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে সমৃদ্ধির বছরগুলোতে শস্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এভাবে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে পরবর্তী সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। (সুরা ইউসুফ: ৪৭-৪৯)

দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলে একজন মুসলমানের করণীয় হলো-

দোয়া, তাওবা ও ইস্তেগফার করা: আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও সাহায্য চাওয়া এবং নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।

সতর্কবার্তা মেনে চলা: আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া।

জরুরি প্রস্তুতি রাখা: প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদে রাখা।

দান-সদকা করা: সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

গুজব এড়িয়ে চলা: যাচাই না করা তথ্য প্রচার না করা এবং ভিত্তিহীন ভবিষ্যদ্বাণীতে আতঙ্কিত না হওয়া।

সতর্কতা, প্রস্তুতি ও আল্লাহর ওপর ভরসা এই তিনটি একসঙ্গে রেখেই দুর্যোগের মুখে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা একজন মুমিনের কর্তব্য।

তথ্যসূত্র: সুরা লুকমান: ৩৪; আহকাফ: ২৪-২৫; রুম: ৪১; বাকারা: ১৫৫; ইউসুফ: ৪৭-৪৯; সহিহ মুসলিম: ৮৯৯, ২২৩০; সহিহ বুখারি: ১০৪৩