Dhaka Mail Logo

ইসলাম

দত্তক সন্তানের সঙ্গে পর্দার বিধান কী

ধর্ম ডেস্ক

২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

অনাথ ও অসহায় শিশুকে আশ্রয় দিয়ে লালন-পালন করা ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি ও ইয়াতিমের তত্ত্বাবধানকারী জান্নাতে এভাবে থাকব।’ এ কথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে ইশারা করেন। (সহিহ বুখারি: ৬০০৫)

তবে দত্তক নেওয়ার কারণে কোনো শিশু পালক মা-বাবার ঔরসজাত সন্তান বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাহরাম হয়ে যায় না। ইসলাম শিশুকে ভালোবাসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা দিয়ে বড় করার প্রতি উৎসাহিত করেছে। একই সঙ্গে তার প্রকৃত বংশপরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের পোষ্যপুত্রদের তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।’ (সুরা আহজাব: ৪)

পরের আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। আল্লাহর কাছে এটাই অধিক ন্যায়সংগত।’ (সুরা আহজাব: ৫)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, দত্তক গ্রহণের কারণে সন্তানের প্রকৃত বংশপরিচয় পরিবর্তিত হয় না। দত্তক সম্পর্কের মাধ্যমে নিজে থেকে মাহরাম সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয় না। শিশুর প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানা না থাকলে তাকে মিথ্যা বংশপরিচয় দেওয়ার পরিবর্তে যথাযথভাবে পরিচিত করতে হবে।

আরও পড়ুন: সন্তানকে কতটুকু শাসন করা জায়েজ? কোরআন ও সহিহ হাদিসের দিকনির্দেশনা

বালেগ হওয়ার পর পর্দার বিধান

কোনো নারী ছেলে শিশুকে দত্তক নিলে, শুধু লালন-পালনের কারণে ছেলেটি তার মাহরাম হবে না। অন্য কোনো শরিয়তসম্মত কারণে মাহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না থাকলে, ছেলেটি বালেগ হওয়ার পর পালক মায়ের সঙ্গে পর্দার বিধান প্রযোজ্য হবে। একইভাবে, কোনো পুরুষ মেয়ে শিশুকে দত্তক নিলে মেয়েটি বালেগ হওয়ার পর পালক বাবার সঙ্গে পর্দা করতে হবে।

শৈশবে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পূর্ণ পর্দার বিধান প্রযোজ্য হয় না। তবে বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী শিশুকে শালীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও দৃষ্টির হেফাজত সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া উচিত।

দুধসম্পর্কের বিধান

শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে দুধসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে মাহরাম সম্পর্ক তৈরি হয়। যেমন, কোনো ছেলে শিশুকে পালক মা শরিয়তসম্মত বয়স ও অন্যান্য শর্তের মধ্যে দুধ পান করালে সে তাঁর দুধসন্তান হয়। তবে কে কাকে দুধ পান করিয়েছেন, শিশুর বয়স কত ছিল এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তার ওপর সম্পর্কের বিধান নির্ভর করে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘বংশসম্পর্কের কারণে যেসব সম্পর্ক হারাম হয়, দুধসম্পর্কের কারণেও সেসব সম্পর্ক হারাম হয়।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৪৫)

সাধারণভাবে দুই চান্দ্রবছরের মধ্যে দুধপানের বিষয়টি আলোচিত হয়। তবে দুধসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত ও প্রয়োগ নিয়ে ফিকহি আলোচনা রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন: সন্তান অবাধ্য হলে করণীয় কী? ইসলামের দিকনির্দেশনা ও মা-বাবার দায়িত্ব

উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির বিধান

দত্তক নেওয়ার কারণে পালক মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তসম্মত উত্তরাধিকার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। তবে পালক মা-বাবা চাইলে জীবদ্দশায় বৈধভাবে সম্পত্তি উপহার দিতে পারেন। মৃত্যুর পর সম্পত্তি দেওয়ার জন্য অসিয়তও করা যায়। সাধারণভাবে অ-উত্তরাধিকারীর অনুকূলে অসিয়ত মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত করা যায়। এর বেশি হলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করতে হয়।

দত্তক সন্তানকে লালন-পালন করা, তার শিক্ষা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং তাকে ভালোবাসা ইসলামে প্রশংসনীয়। এসব দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে নিজের ঔরসজাত সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া জরুরি নয়।

বংশপরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি

দত্তক সন্তানের প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানা থাকলে তা গোপন করে অন্য কাউকে তার পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। জন্মসনদসহ দাপ্তরিক নথিতে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখার নীতি অনুসরণ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিধান মেনে চলতে হবে। শিশুর পরিচয় অজানা হলে তাকে মিথ্যা পরিচয় দেওয়ার পরিবর্তে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

ইসলাম অনাথ ও অসহায় শিশুকে আশ্রয় দেওয়া, স্নেহে বড় করা এবং তার অধিকার রক্ষায় উৎসাহিত করেছে। তবে দত্তক গ্রহণের কারণে বংশপরিচয়, উত্তরাধিকার বা মাহরাম সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যায় না। প্রকৃত পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা এবং শরিয়তের নির্ধারিত পর্দা ও অন্যান্য বিধান মেনে চলার মাধ্যমেই শিশুর প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা যথাযথভাবে পালন করা যায়।

তথ্যসূত্র: সুরা আহজাব: ৪-৫; সহিহ বুখারি: ২৬৪৫, ৬০০৫