Dhaka Mail Logo

ইসলাম

ইসলামে আত্মপ্রশংসার ৭ ক্ষতি

ধর্ম ডেস্ক

১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

অনেকে নিজের জ্ঞান, যোগ্যতা, সম্পদ কিংবা সাফল্যের কথা অন্যদের কাছে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। কেউ নিজের নেক আমলের কথা বলে বেড়ান, কেউ নিজের গুণের কথা প্রচার করে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চান। নিজের সম্পর্কে ভালো কথা বলা সবসময় দোষের নয়। তবে নিজেকে বড় দেখানো কিংবা অন্যকে ছোট করার উদ্দেশ্যে আত্মপ্রশংসা করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কাজেই তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তা তিনি ভালো করেই জানেন।’ (সুরা নাজম: ৩২)

আমরা নিজেদের কাজ সম্পর্কে জানলেও আমাদের অন্তরের অবস্থা ও নিয়ত আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই নিজের প্রশংসা করতে গিয়ে যেন অহংকারে জড়িয়ে না পড়ি। কারণ আত্মপ্রশংসা মানুষের আচরণ, ইবাদত ও অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

১. আত্মপ্রশংসা অহংকার বাড়ায়

নিজের গুণ, জ্ঞান কিংবা সাফল্য নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করতে করতে মানুষ একসময় নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় মনে করতে শুরু করতে পারে। তখন অন্যের ভালো কাজও তার চোখে ছোট মনে হয়। এমন মনোভাব মানুষকে সত্য গ্রহণ ও অন্যের মর্যাদা স্বীকার করা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘অহংকার হলো দম্ভভরে সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা বা ছোট করা।’ (সহিহ মুসলিম: ৯১)

তাই নিজের যোগ্যতা নিয়ে গর্ব করতে গিয়ে যেন অন্যকে ছোট না করি এবং সত্য কথা মেনে নিতে পিছপা না হই।

২. নেক আমলের নিয়ত নষ্ট হতে পারে

মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দান করে কিংবা অন্যের উপকার করে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায়। কিন্তু এসব কাজের কথা বলে যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়াই মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায়, তাহলে ইবাদতের নিয়ত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা বাইয়িনা: ৫)

আরও পড়ুন: নেকি খেয়ে ফেলে যে ৬ গুনাহ 

তাই নিজের নেক আমলের কথা বলার আগে ভেবে দেখা দরকার, কেন কথাটি বলছি। কাউকে ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া বা প্রয়োজনের কারণে নিজের অভিজ্ঞতা জানানো দোষের নয়। সমস্যা তখনই, যখন উদ্দেশ্য হয় নিজের ধার্মিকতা জাহির করা কিংবা মানুষের প্রশংসা পাওয়া।

৩. নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ হারাতে হয়

আত্মপ্রশংসায় অভ্যস্ত ব্যক্তি নিজের ভুলের চেয়ে নিজের গুণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি তা সহজে গ্রহণ করতে চান না। কখনো অজুহাত দেন, কখনো সমালোচনাকারীকেই দোষারোপ করেন।

অথচ নিজের ভুল বুঝতে পারা সংশোধনের প্রথম ধাপ। ভুল স্বীকার করলে তা থেকে ফিরে আসা, আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং ভবিষ্যতে একই ভুল এড়িয়ে চলা সহজ হয়। তাই নিজের প্রশংসায় মগ্ন না থেকে আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

৪. অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়

নিজেকে বড় মনে করলে অন্যকে ছোট ভাবার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কেউ নিজের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করে কম জানা মানুষকে অপমান করেন। কেউ সম্পদ নিয়ে অহংকার করে দরিদ্রকে তুচ্ছ ভাবেন। আবার কেউ নিজের ইবাদত নিয়ে গর্ব করে অন্যের আমলকে ছোট করে দেখেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত: ১১)

কে আল্লাহর কাছে কতটা মর্যাদাবান, তা আমরা জানি না। তাই নিজের গুণ বা আমল নিয়ে গর্ব করে অন্যকে অপমান করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৫. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা কমে যেতে পারে

জ্ঞান, সম্পদ, প্রতিভা কিংবা সাফল্য অর্জনে মানুষের চেষ্টা থাকে। তবে চেষ্টা করার সামর্থ্য ও সুযোগও আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। কেউ যখন নিজের সাফল্যের সব কৃতিত্ব নিজের যোগ্যতাকে দেন, তখন আল্লাহর অনুগ্রহের কথা ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কারূন তার সম্পদ সম্পর্কে বলেছিল, ‘এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানের কারণে পেয়েছি।’ (সুরা কাসাস: ৭৮)

কারূনের ঘটনা আমাদের সতর্ক করে যে, নিজের অর্জন নিয়ে অহংকার করা উচিত নয়। কোনো কাজে সফল হলে নিজের চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করা এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: অহংকার পতনের মূল সম্পর্কে হাদিস-কোরআন

৬. মানুষের প্রশংসার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে

যে ব্যক্তি বারবার নিজের গুণ ও সাফল্যের কথা বলেন, তিনি একসময় মানুষের প্রশংসার অপেক্ষায় থাকতে পারেন। কেউ প্রশংসা না করলে তার মন খারাপ হয়। আবার প্রশংসা পাওয়ার আশায় নিজের ভালো কাজের কথা বাড়িয়ে বলার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।

এমন অভ্যাস ইবাদতের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। তখন আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষ কী ভাবছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই মানুষের প্রশংসার অপেক্ষা না করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

৭. আত্মতুষ্টির কারণে উন্নতির আগ্রহ কমে যায়

নিজের গুণ ও অর্জন নিয়ে অতিরিক্ত সন্তুষ্ট থাকলে মানুষ ভাবতে পারেন, তার আর নিজেকে শুধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ফলে নতুন কিছু শেখা, নিজের দুর্বলতা দূর করা কিংবা আমলের মান উন্নত করার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

অথচ একজন মুমিনের উচিত নিজের ভুল-ত্রুটি মনে রাখা, তাওবা করা এবং আল্লাহর কাছে আমল কবুলের জন্য দোয়া করা। নিজের ভালো কাজ নিয়ে গর্বে মগ্ন না থেকে আরও ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করাই উত্তম।

নিজের যোগ্যতার কথা বলা কি দোষের?

ইসলামে প্রয়োজনের সময় নিজের যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার কথা বলা নিষিদ্ধ নয়। হজরত ইউসুফ (আ.) রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব দিন, নিশ্চয় আমি যথাযথ হেফাজতকারী, সুবিজ্ঞ।’ (সুরা ইউসুফ: ৫৫)

তিনি দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা বোঝানোর জন্য নিজের গুণের কথা বলেছিলেন, অন্যের চেয়ে বড় প্রমাণ করার জন্য নয়। তাই প্রয়োজনের কারণে নিজের যোগ্যতা জানানো আর আত্মপ্রশংসা করা এক বিষয় নয়।

একইভাবে নিজের জীবনের কোনো ভালো পরিবর্তনের কথা বলে অন্যকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। তবে কথা বলার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যেন তা নিজের বড়াই করা কিংবা অন্যকে ছোট করার কারণ না হয়।

আত্মপ্রশংসা থেকে বাঁচবেন যেভাবে

  • নিজের অর্জনের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
  • নেক আমল করার সময় মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দিন।
  • নিজের ভুল স্বীকার করুন এবং অন্যের ভালো পরামর্শ গ্রহণ করুন।
  • অন্যের গুণের প্রশংসা করুন, কাউকে ছোট করে দেখবেন না।
  • নিজের নিয়ত যাচাই করুন, বিশেষ করে দান-সদকা ও নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে।
  • নিজের গুণের কথা বারবার বলার বদলে কাজ ও আচরণের মাধ্যমে তা প্রকাশ পেতে দিন।

নিজের ভালো কাজ বা যোগ্যতার কথা বলা দোষের নয়, যদি তা প্রয়োজনের কারণে বলা হয়। তবে নিজেকে বড় দেখানো, অন্যকে ছোট করা কিংবা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নিজের গুণের প্রচার করা থেকে সতর্ক থাকা উচিত। প্রশংসা শোনার চেয়ে নিজের ভুল শুধরে নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: সুরা নাজম: ৩২; সুরা বাইয়িনা: ৫; সুরা হুজুরাত: ১১; সুরা কাসাস: ৭৮; সুরা ইউসুফ: ৫৫; সহিহ মুসলিম: ৯১