ধর্ম ডেস্ক
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
মানুষের কথা বা আচরণে কষ্ট পাওয়া জীবনেরই অংশ। কখনো কাছের মানুষ অপমান করে, কখনো পরিচিত কেউ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, আবার কখনো অপরিচিত কারও রূঢ় আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। মনে হয়, সঙ্গে সঙ্গে এমন জবাব দিই, যাতে অন্য ব্যক্তিও নিজের আচরণের কষ্ট বুঝতে পারে।
কিন্তু একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, অন্যের আচরণের জবাবে তিনি নিজে কেমন আচরণ করছেন। ইসলাম সুন্দর আচরণ, ক্ষমা ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন আমাদের জন্য অনন্য আদর্শ।
কেউ অপ্রীতিকর আচরণ করলে প্রথমেই নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। কারণ রাগের বশে বলা একটি কথা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কখনো সামান্য বিরোধও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কারণে বড় বিবাদে রূপ নেয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। প্রকৃত শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৯)
তাই কেউ আপনাকে রাগিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ থামুন। নিজেকে শান্ত হতে সময় দিন। এরপর ভাবুন, কোন কথাটি সমস্যার সমাধান করবে, আর কোনটি পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।
কেউ আপনার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে বলে আপনাকেও তার সঙ্গে একই আচরণ করতে হবে, এমন নয়। সম্ভব হলে উত্তম আচরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করুন তা দিয়ে, যা উত্তম। তখন আপনার সঙ্গে যার শত্রুতা রয়েছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা ফুসসিলাত: ৩৪)
আরও পড়ুন: স্বার্থের জন্য কেউ ভালো ব্যবহার করলে মুমিন কী করবেন
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনেও এর অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, একবার তিনি নবীজি (স.)-এর সঙ্গে হাঁটছিলেন। তখন এক বেদুঈন এসে তাঁর চাদর সজোরে টান দিল। এতে নবীজি (স.)-এর কাঁধে চাদরের পাড়ের দাগ পড়ে গেল। লোকটি রূঢ়ভাবে তাঁর কাছে সম্পদ দাবি করল। নবীজি (স.) তার দিকে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি: ৩১৪৯)
ঘটনাটি শেখায়, অন্যের রূঢ় আচরণের মুখেও সংযম ও উদারতা দেখানো সম্ভব। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের অন্যায় নীরবে মেনে নিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী শান্তভাবে প্রতিবাদ করাও প্রয়োজন হতে পারে।
মানুষ মাত্রই ভুল করে। অনেক সময় কেউ না বুঝে এমন কথা বলে ফেলে, যা অন্যের মনে আঘাত দেয়। প্রতিটি ভুলের প্রতিশোধ নিতে গেলে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ে এবং বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নূর: ২২)
এই আয়াত অন্যের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করার প্রতি উৎসাহিত করে। কেউ অনুতপ্ত হলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিন। ভুল বোঝাবুঝি হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।
তবে ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। কেউ বারবার অপমান করলে বা ক্ষতি করতে থাকলে নিজের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: আত্মীয় জালেম হলে কেমন ব্যবহার করা উচিত
ধৈর্য ও ক্ষমা মহৎ গুণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্যায় হলে প্রতিবাদ করা যাবে না। কেউ আপনার অধিকার নষ্ট করলে, দুর্বল কাউকে নির্যাতন করলে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করতে থাকলে যথাযথ উপায়ে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন।
প্রতিবাদ করার সময় ভাষা ও আচরণ সংযত রাখুন। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন, কোন আচরণটি গ্রহণযোগ্য নয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন।
ইসলাম ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। তাই অন্যের প্রতি সদাচরণ বজায় রাখার পাশাপাশি নিজের ও অন্যের অধিকার রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ আপনাকে অপমান করেছে। এরপর দিনের পর দিন সেই কথাগুলো মনে করে কষ্ট পাচ্ছেন, কীভাবে তাকে জবাব দেবেন তা ভাবছেন। এতে ঘটনাটির প্রভাব আপনার মনে আরও দীর্ঘ সময় থেকে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে ধীরে ধীরে সেই চিন্তা থেকে সরিয়ে আনুন। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলুন, নিজের কাজে মনোযোগ দিন এবং আল্লাহর কাছে প্রশান্তি চান।
ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে অন্য ব্যক্তির আচরণ সঠিক ছিল। এর অর্থ হতে পারে, আপনি প্রতিশোধের চিন্তাকে নিজের জীবন ও মানসিক প্রশান্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দিতে চান না।
কেউ অন্যায় করলে তার সমপরিমাণ প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ক্ষমা ও সংশোধনের পথ বেছে নেওয়া অনেক সময় অধিক কল্যাণকর হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে।’ (সুরা শুরা: ৪০)
ক্ষমা ও আপসের মাধ্যমে কল্যাণের পথ তৈরি হলে তা মূল্যবান আমল। তবে ক্ষমা যেন অন্যায় বাড়িয়ে দেওয়ার কারণ না হয়। নিজের অধিকার রক্ষা এবং অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও ইসলাম রেখেছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের রাগ সংবরণ, ক্ষমা ও ধৈর্যের গুণ দান করুন এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর উত্তম আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা ফুসসিলাত: ৩৪; সুরা নূর: ২২; সুরা শুরা: ৪০; সহিহ বুখারি: ৩১৪৯, ৬১১৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৯