ধর্ম ডেস্ক
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
কেউ বিশ্বাস করে নিজের ব্যক্তিগত কষ্ট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা জীবনের কোনো সংবেদনশীল ঘটনার কথা বন্ধু-বান্ধবের কাছে প্রকাশ করেন। তখন তাঁর প্রত্যাশা থাকে, অনুমতি ছাড়া কথাটি অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হবে না। এই বিশ্বাস রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামের দৃষ্টিতেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানুষের সম্মান এবং আমানতদারির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
আমানত বলতে আমরা সাধারণত গচ্ছিত অর্থসম্পদ বুঝি। তবে আমানতদারির বিষয়টি আরও বিস্তৃত। কেউ বিশ্বাস করে কোনো কথা বললে এবং পরিস্থিতি থেকে বোঝা গেলে যে তিনি সেটি গোপন রাখতে চান, তাহলে তাঁর সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করাও দায়িত্বের অংশ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলে, তারপর এদিক-সেদিক তাকায়, তখন তা আমানত।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৬৮)
হাদিসটি ব্যক্তিগত কথার গোপনীয়তা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। তাই কেউ বিশ্বাস করে নিজের একান্ত কোনো কথা বললে, তা প্রকাশের আগে তাঁর অনুমতি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৭০)
মানুষের এই মর্যাদা রক্ষা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা, গোপন দোষ খুঁজে বেড়ানো কিংবা তা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে অপদস্থ করা এই শিক্ষার পরিপন্থী।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা গুনাহ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং তোমাদের কেউ যেন অন্যের গীবত না করে।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)
আরও পড়ুন: অন্যের গোপন কথা কানে এলে যা করবেন
এই আয়াতে কুধারণা, মানুষের গোপন বিষয় অনুসন্ধান এবং গীবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই কারও ব্যক্তিগত ভুল বা দুর্বলতার কথা জানার পর তা অপ্রয়োজনে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
কেউ গোপনে কথা বলছেন বুঝতে পারলে ইচ্ছা করে কান পেতে শোনা উচিত নয়। অনিচ্ছায় কারও ব্যক্তিগত কথা কানে এলে তা জানার আগ্রহে মনোযোগ দিয়ে শোনা বা পরে অন্যের কাছে খোঁজখবর নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। সম্ভব হলে সেখান থেকে সরে যাওয়া কিংবা নিজের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া উচিত।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো বান্দার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৯০)
এই হাদিস অন্যের দোষ গোপন রাখার মর্যাদা তুলে ধরে। কারও ব্যক্তিগত ভুল জানলে তা নিয়ে প্রচার না করে, সম্ভব হলে একান্তে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া উত্তম। এতে তাঁর সম্মান রক্ষা পায় এবং ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে দোষ গোপন রাখার অর্থ অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। ব্যক্তিগত ভুল আর অন্যের অধিকার নষ্ট করা বা কারও নিরাপত্তা বিপন্ন করার মতো ঘটনা এক বিষয় নয়। অপরাধ, নির্যাতন, প্রতারণা কিংবা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে যথাযথ ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন হতে পারে।
ইসলামে মানুষের গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ থাকলেও ন্যায়বিচার ও ক্ষতি প্রতিরোধের প্রয়োজনে কিছু ক্ষেত্রে অন্যায়ের কথা প্রকাশ করা বৈধ হতে পারে। যেমন, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া, জুলুমের প্রতিকার চাওয়া, প্রতারণা থেকে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সতর্ক করা কিংবা প্রয়োজনীয় ধর্মীয় পরামর্শ নেওয়া।
আরও পড়ুন: যে ৬ বিষয় মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখা উত্তম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা পছন্দ করেন না, তবে যে ব্যক্তি জুলুমের শিকার হয়েছে, তার কথা ভিন্ন।’ (সুরা নিসা: ১৪৮)
অর্থাৎ, জুলুমের শিকার ব্যক্তি নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের কথা যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেন। তবে এসব ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ক্ষতি প্রতিরোধ বা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া। কাউকে অপমান করা, প্রতিশোধ নেওয়া কিংবা অপ্রয়োজনে তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এর উদ্দেশ্য হতে পারে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট, ছবি, ভিডিও কিংবা গোপন তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি পোস্ট বা শেয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তিগত তথ্য হাতে এলেই তা প্রকাশ করা বা অন্যের কাছে পাঠানো উচিত নয়।
কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে প্রচার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আগে ভাবতে হবে, এতে তার সম্মান বা অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না। গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণ করাও প্রত্যেকের কর্তব্য।
অন্যের ব্যক্তিগত কথা গোপন রাখা অনেক ক্ষেত্রে আমানতদারির অংশ। কেউ বিশ্বাস করে নিজের মনের কথা বললে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা, মানুষের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা এবং প্রয়োজন হলে গোপনে সংশোধনের সুযোগ করে দেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে অন্যায় ও জুলুমের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতি প্রতিরোধের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: সুরা বনি ইসরাঈল: ৭০; সুরা হুজুরাত: ১২; সুরা নিসা: ১৪৮; সহিহ মুসলিম: ২৫৯০; সুনান আবু দাউদ: ৪৮৬৮