ধর্ম ডেস্ক
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
ইসলামে বিপদ-আপদের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। কখনো মানুষের অন্যায় কাজের পরিণতি হিসেবে বিপদ আসতে পারে। আবার বিপদ হতে পারে ঈমানের পরীক্ষা কিংবা গুনাহ মোচনের মাধ্যম। তাই কারও বিপদ দেখেই সেটিকে পাপের শাস্তি বলে চিহ্নিত করা সঠিক নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের হাতের কামাইয়ের কারণেই। আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা: ৩০)
আয়াতটি মানুষের কাজের সঙ্গে বিপদ-আপদের সম্পর্কের কথা জানায়। তবে সাধারণ নীতি জানা আর কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা এক বিষয় নয়। এ আয়াতের ভিত্তিতে কারও অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা আর্থিক ক্ষতিকে তাঁর নির্দিষ্ট কোনো পাপের শাস্তি বলে দেওয়া যায় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে, “আমরা ঈমান এনেছি” বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?’ (সুরা আনকাবুত: ২)
পরের আয়াতে আল্লাহ জানান, আগের মানুষদেরও পরীক্ষা করা হয়েছে, যাতে সত্যবাদীদের পরিচয় প্রকাশ পায়। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা: ১৫৫)
আরও পড়ুন: শাস্তির আগে সতর্কতা : আল্লাহর ন্যায়বিচারের মহান নীতি
এ থেকে বোঝা যায়, ঈমানদার হওয়া মানেই দুনিয়ায় বিপদমুক্ত জীবন পাওয়া নয়। তাই কেউ বিপদে পড়েছেন বলে তিনি আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে কার ওপর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে। তিনি বলেন, নবীদের ওপর, এরপর তাঁদের পরবর্তী উত্তম ব্যক্তিদের ওপর। মানুষের দ্বীনের দৃঢ়তা অনুযায়ী তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। (জামে তিরমিজি: ২৩৯৮)
নবী-রাসুলরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়েও কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। সুতরাং বিপদে পড়া মানেই কেউ গুনাহগার কিংবা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়-এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মুসলিম ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট কিংবা মানসিক পীড়নের শিকার হলে, এমনকি একটি কাঁটা বিঁধলেও, আল্লাহ এর মাধ্যমে তাঁর কিছু গুনাহ মাফ করে দেন। (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১-৫৬৪২)
অর্থাৎ একজন মানুষ যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা তার জন্য গুনাহ মোচনের মাধ্যমও হতে পারে। তাই তার কষ্টকে ‘পাপের শাস্তি’ বলে নিশ্চিত মন্তব্য করলে হাদিসে বর্ণিত সান্ত্বনা ও আশার দিকটি উপেক্ষিত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি তাদেরকে বড় শাস্তির আগে ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা সাজদাহ: ২১)
এই আয়াত মানুষকে নিজের কাজ পর্যালোচনা করা, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং তাওবা করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে নিজের জীবনের জন্য আত্মসমালোচনা করা আর অন্যের বিপদকে তাঁর পাপের শাস্তি বলে ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিপদকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বলার মতো জ্ঞান আমাদের নেই।
আরও পড়ুন: আল্লাহর আজাব থেকে নিরাপদ থাকার দোয়া
কেউ সম্পদশালী ও সুস্থ বলেই আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাবান, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। একইভাবে কেউ অভাব, অসুস্থতা কিংবা দুঃখ-কষ্টে আছেন বলেই আল্লাহর কাছে অপমানিত, এমন ধারণাও সঠিক নয়।
সুরা ফাজরে আল্লাহ তাআলা সম্পদ ও প্রাচুর্যকে সম্মানের এবং অভাবকে অপমানের প্রমাণ মনে করার মানুষের ধারণা সংশোধন করেছেন। (সুরা ফাজর: ১৫-১৭)
দুনিয়ার বাহ্যিক অবস্থা দিয়ে আখেরাতে কারও মর্যাদা কিংবা আল্লাহর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের চূড়ান্ত বিচার করা যায় না।
কেউ বিপদে পড়লে তাঁর গুনাহের হিসাব নেওয়ার চেয়ে পাশে দাঁড়ানো বেশি জরুরি। এমন সময় বলা যেতে পারে, ‘আল্লাহ আপনার কষ্ট সহজ করে দিন।’ ‘আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দিন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুন।’ ‘কোনো সাহায্য লাগলে জানাবেন।’ ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।’
কারও ভুলের কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে মনে হলেও তাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া যায়। অন্যের বিপদকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিপদ এলে একজন মুমিন নিজের কাজ পর্যালোচনা করতে পারেন, গুনাহের জন্য তাওবা করতে পারেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারেন। কিন্তু অন্যের বিপদ দেখে তার অন্তরের অবস্থা কিংবা আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া আমাদের কাজ নয়।
কষ্টের সময় একটি সহানুভূতিশীল কথা, সামান্য সহযোগিতা কিংবা আন্তরিক দোয়া মানুষের জন্য বড় সান্ত্বনা হতে পারে। অন্যদিকে, ‘এটা তোমার পাপের শাস্তি’ ধরনের মন্তব্য তাঁর মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিপদ কখনো পরীক্ষা, কখনো গুনাহ মোচনের মাধ্যম, আবার কখনো মানুষের কাজের পরিণতি। কিন্তু নির্দিষ্ট কারও বিপদের প্রকৃত কারণ না জেনে সেটিকে পাপের শাস্তি বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়। তাই বিপদগ্রস্ত মানুষকে দোষারোপ না করে তাঁর পাশে দাঁড়াই, সান্ত্বনা দিই এবং তাঁর জন্য দোয়া করি। আল্লাহর কাছে আমাদের সবারই ক্ষমা, রহমত ও নিরাপত্তা চাওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: সুরা আনকাবুত: ২-৩; সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৬; সুরা শুরা: ৩০; সুরা সাজদাহ: ২১; সুরা ফাজর: ১৫-১৭; সহিহ বুখারি: ৫৬৪১-৫৬৪২; জামে তিরমিজি: ২৩৯৮