Dhaka Mail Logo

ইসলাম

গুনাহে ডুবে থাকাটাই কি শাস্তি?

ধর্ম ডেস্ক

১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

মানুষ সাধারণত শাস্তি বলতে বোঝে অসুস্থতা, বিপদ, অভাব কিংবা জীবনের কোনো ক্ষতি। অথচ কখনো কখনো মানুষ এমন এক অবস্থায় থাকে, যার ভয়াবহতা সে নিজেই বুঝতে পারে না। সে গুনাহ করে যাচ্ছে, অথচ অনুশোচনা হচ্ছে না। হারাম কাজে জড়িয়ে আছে, অথচ তা ছেড়ে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করছে না। আল্লাহর অবাধ্যতা চলছে, অথচ অন্তরে তেমন কোনো অস্বস্তিও নেই।

এই অবস্থা আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। কারণ, গুনাহের পরিণতি শুধু আখেরাতের জবাবদিহির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বারবার গুনাহ করতে থাকলে মানুষের অন্তরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কখনোই নয়, বরং তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের অন্তরে মরিচা জমেছে।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ১৪)

আয়াতটি মনে করিয়ে দেয়, বারবার অন্যায় করতে থাকলে একসময় অন্যায়কে অন্যায় মনে করার অনুভূতিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

গুনাহের পর অনুশোচনা না হওয়া কেন ভাবনার বিষয়?

কেউ গুনাহ করে ফেলল, তারপর অনুতপ্ত হলো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করল। এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথ। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনাই হয় না, তাহলে নিজের অবস্থা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মুমিন ও পাপাচারীর অনুভূতির পার্থক্য বোঝাতে একটি গভীর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, মুমিন নিজের গুনাহকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় করছে, পাহাড়টি তার ওপর ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারী নিজের গুনাহকে দেখে নাকের ওপর বসা মাছির মতো, যা সে হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। (সহিহ বুখারি: ৬৩০৮)

আরও পড়ুন: গুনাহের পর অনুতপ্ত মনে ক্ষমা প্রার্থনার ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর সে যদি গুনাহ থেকে বিরত হয়, ক্ষমা চায় এবং তাওবা করে, তাহলে তার অন্তর পরিষ্কার করে দেওয়া হয়। আর যদি সে আবার গুনাহ করে, অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়।’ (জামে তিরমিজি: ৩৩৩৪)

তাই গুনাহের পর অনুশোচনা হওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং নিজেকে সংশোধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুনাহের মধ্যে থেকেও সচ্ছলতা মানেই কি আল্লাহ সন্তুষ্ট?

কেউ অন্যায় করছে, অথচ তার জীবনে অভাব নেই। ব্যবসায় উন্নতি হচ্ছে, সম্পদ বাড়ছে, সামাজিক মর্যাদাও অটুট। তখন সে ভাবতে পারে, তার জীবনে তো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু দুনিয়ার সচ্ছলতা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিশ্চিত প্রমাণ নয়। একইভাবে অসুস্থতা, অভাব বা বিপদও আল্লাহর অসন্তুষ্টির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি মনে করে, আমি তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে যাচ্ছি বলে তাদের জন্য সব রকমের কল্যাণ দ্রুত এনে দিচ্ছি? না, তারা বোঝে না।’ (সুরা মুমিনুন: ৫৫-৫৬)

তাই গুনাহের মধ্যে থেকেও দুনিয়াবি সুবিধা পেতে থাকলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। জীবনের প্রকৃত সফলতা শুধু সম্পদ, সম্মান কিংবা আরাম দিয়ে মাপা যায় না।

আরও পড়ুন: গুনাহ মাফের ১০ আমল: কোরআন-হাদিসে বর্ণিত সহজ পথ

সবচেয়ে বড় বিপদ, নিজের অবস্থাকে বিপদ মনে না করা

মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেয়, অভাবে পড়লে রিজিকের চেষ্টা করে, বিপদ এলে মুক্তির পথ খোঁজে। কিন্তু নিজের অন্তর গুনাহে আক্রান্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কয়জন ভাবে?

নামাজে অনীহা তৈরি হচ্ছে কি না, হারাম উপার্জনকে সহজ মনে হচ্ছে কি না, মানুষের অধিকার নষ্ট করেও অনুশোচনা হচ্ছে না কি না, গিবত ও মিথ্যাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে কি না- এসব প্রশ্ন নিজের কাছেও রাখা জরুরি।

তবে গুনাহের পর অনুশোচনা কমে যাওয়া বা ইবাদতে দুর্বলতা অনুভব করলেই কাউকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সে আল্লাহর শাস্তির মধ্যে আছে। অন্তরের প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন। এসব লক্ষণ নিজের অবস্থা পর্যালোচনা ও সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়।

ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা

গুনাহে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ মানুষ জীবিত, ততক্ষণ তাওবার সুযোগ আছে। প্রয়োজন নিজের ভুল স্বীকার করা, গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার: ৫৩)

এই আয়াত হতাশ মানুষের জন্য আশার বার্তা। অতীতে যত ভুলই হয়ে থাকুক, আন্তরিকভাবে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ আছে।

দুনিয়ার ক্ষতি মানুষ সহজেই দেখতে পায়। কিন্তু অন্তরের ক্ষতি সব সময় চোখে পড়ে না। তাই জীবনে বিপদ না থাকলেই নিশ্চিন্ত না হয়ে নিজের অন্তরের দিকেও তাকানো দরকার। গুনাহের পর অনুশোচনা হচ্ছে কি না, ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করছেন কি না, মানুষের হক রক্ষা করছেন কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

আল্লাহ আমাদের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার, ভুল হলে অনুতপ্ত হওয়ার এবং আন্তরিকভাবে তাওবা করে তাঁর দিকে ফিরে আসার তাওফিক দিন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সুরা মুতাফফিফিন: ১৪, সুরা মুমিনুন: ৫৫-৫৬, সুরা জুমার: ৫৩। সহিহ বুখারি: ৬৩০৮, জামে তিরমিজি: ৩৩৩৪