ধর্ম ডেস্ক
১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম
কোনো ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা সামনে এলে অপরাধীর বিচার দাবি করা, ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধের উপায় খোঁজা জরুরি। কিন্তু অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন ভুক্তভোগী। তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে মিশতেন, কী পোশাক পরতেন কিংবা কেন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এসব প্রশ্ন ঘুরতে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও আড্ডায়। একপর্যায়ে অপরাধীর দায় ও জবাবদিহির বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায়। ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষা এ প্রবণতাকে সমর্থন করে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪)
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, একজনের কাজের দায় অন্যের ওপর চাপানো যায় না। কেউ ধর্ষণ, নির্যাতন বা হত্যার মতো অপরাধ করলে তার দায় অপরাধীরই। ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, পরিচিতজন কিংবা ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে সেই দায় মুছে ফেলা যায় না। কেউ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গেলেই তাঁর ওপর হামলা করার অধিকার কারও জন্মায় না। অপরাধ করার সিদ্ধান্ত অপরাধীই নিয়েছে, তাই তার কাজের জবাবদিহিও তাকেই করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। তোমরা ন্যায়বিচার করো। এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা: ৮)
তিনি আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসেবে।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)
আরও পড়ুন: অল্প সময়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সেই মুসলিম শাসক
কারও কোনো আচরণ পছন্দ না হলেও তাঁর প্রতি সংঘটিত অপরাধের বিচার দাবি করা থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীকে অপমান করা, তাঁর চরিত্র নিয়ে অনুমাননির্ভর মন্তব্য করা কিংবা অপরাধের জন্য তাঁকেই দায়ী করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
কোনো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্য যাচাই এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল মেটাতে তথ্য ছড়ানো কিংবা তাঁকে হেয় করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
অপরাধের পর অনেক সময় যাচাই না করা তথ্য, ব্যক্তিগত কথোপকথন কিংবা ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবার নতুন করে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখে পড়েন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)
রাসুলুল্লাহ (স.) গিবতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, কথাটি তার মধ্যে সত্যিই থাকলে কী হবে? তিনি বলেন, ‘তুমি যা বলছ, তা তার মধ্যে থাকলে তুমি তার গিবত করলে। আর তা তার মধ্যে না থাকলে তুমি তার প্রতি অপবাদ দিলে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)
কোনো কথা সত্য হলেই তা প্রচার করা সব ক্ষেত্রে বৈধ হয়ে যায় না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য জানানো আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হেয় করতে তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় ছড়িয়ে দেওয়া এক নয়।
প্রমাণ ছাড়া কারও চরিত্র নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলাও ইসলামে হালকা বিষয় নয়। পবিত্র কোরআনে সতী নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দিয়ে চারজন সাক্ষী হাজির করতে না পারার বিষয়ে কঠোর বিধান এসেছে। (সুরা নূর: ৪) আয়াতটির নির্দিষ্ট বিধান ও প্রয়োগের শর্ত রয়েছে। তাই ব্যভিচারের অপবাদের বিধান এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগের তদন্তকে এক করে দেখা উচিত নয়। তবে কারও চরিত্র নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে প্রমাণ ও সতর্কতার গুরুত্ব এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৮)
আরও পড়ুন: কেমন ন্যায়বিচারের কথা বলে ইসলাম
জুলুম শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির সম্মানহানি করা, তাঁকে অপমান করা কিংবা তাঁর প্রতি অবিচার করাও জুলুমের পর্যায়ে পড়তে পারে। তাই ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে তাঁর কষ্ট বাড়ানো এবং অপরাধীর দায় আড়াল করার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক বা মজলুম।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, জালিমকে কীভাবে সাহায্য করবেন? তিনি বলেন, ‘তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে। এটাই তার সাহায্য।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৪৪)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখাও জরুরি। অপরাধীর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর নামে তার অন্যায় আড়াল করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
ন্যায়বিচারের জন্য ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য যাচাই করা যেতে পারে। ভুক্তভোগী কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, কোথায় গিয়েছিলেন কিংবা কীভাবে ঘটনার মধ্যে পড়লেন- এসব তথ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু তদন্তের প্রয়োজনে তথ্য যাচাই করা এবং ভুক্তভোগীকে নৈতিকভাবে হেয় করা এক বিষয় নয়।
কেউ ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তা নিয়ে উপদেশ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের কারণে অন্যের অপরাধ বৈধ হয়ে যায় না। সন্তানকে নিরাপদ রাখতে অভিভাবকের সতর্কতা দায়িত্বের অংশ। তবে নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর জন্য, আর অপরাধের দায় ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো অন্যায়।
একইভাবে, কোনো অভিযোগ উঠলেই প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্তের বক্তব্য শোনা এবং ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। ভুক্তভোগীর প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর অর্থ প্রমাণ ছাড়াই রায় দিয়ে দেওয়া নয়। আবার অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার অর্থ ভুক্তভোগীকে অপমান করা কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়ানোর অনুমতিও নয়।
অপরাধের ঘটনা সামনে এলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ইনসাফ। অপরাধ যে করেছে, জবাবদিহি তার। ভুক্তভোগীর পোশাক, বন্ধুত্ব কিংবা চলাফেরা অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও অভিযুক্তের ন্যায়সংগত বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। সমাজের দায়িত্ব হলো সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করা, অন্যায়ের শিকার মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা এবং অপরাধীকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনার পক্ষে দাঁড়ানো। অপরাধীর দায় আড়াল করে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা ন্যায়বিচারের চেতনার পরিপন্থী।
তথ্যসূত্র: সুরা আনআম: ১৬৪; সুরা মায়িদা: ৮; সুরা নিসা: ১৩৫; সুরা হুজুরাত: ১২; সুরা নূর: ৪; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৮, ২৫৮৯; সহিহ বুখারি: ২৪৪৪