Dhaka Mail Logo

ইসলাম

‘উম্মাহর আমানতদার’ আবু উবাইদা (রা.)

ধর্ম ডেস্ক

০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পরিচয় শুধু তাঁদের বীরত্ব দিয়ে নয়, সততা, বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ববোধ দিয়েও স্মরণ করা হয়। সাহাবি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) ছিলেন তাঁদেরই একজন। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে এমন একটি উপাধি দিয়েছিলেন, যা তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তুলে ধরে- ‘উম্মাহর আমানতদার’।

আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের একজন আমানতদার থাকে। আর এই উম্মতের আমানতদার হলেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ।’ (সহিহ বুখারি: ৩৭৪৪)

একজন মানুষের সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতি নবীজি (স.)-এর এই স্বীকৃতি আবু উবাইদা (রা.)-এর মর্যাদা বোঝার জন্য যথেষ্ট। তবে তাঁর জীবনের নানা ঘটনা দেখলে বোঝা যায়, এই পরিচয়ের পেছনে ছিল দায়িত্বশীলতা, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য।

উহুদের ময়দানে নবীজি (স.)-এর পাশে

আবু উবাইদা (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের মুসলমানদের একজন। তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে বদরসহ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও অভিযানে অংশ নেন। উহুদের যুদ্ধেও তাঁর উপস্থিতি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সীরাত ও সাহাবিদের জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর মুখমণ্ডলে আঘাত লাগে এবং তাঁর বর্মের দুটি ধাতব কড়া গালের মধ্যে ঢুকে যায়। আবু উবাইদা (রা.) সেগুলো বের করে আনেন। এতে তাঁর সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায় বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

আরও পড়ুন: বদরের ৩১৩ সাহাবির নাম

এই ঘটনা তাঁর আত্মত্যাগের একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে জীবনীগ্রন্থগুলোতে আলোচিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সুরক্ষায় সাহাবিদের আন্তরিকতা বোঝার ক্ষেত্রে ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওহুদ পাহাড়, ৩ হিজরিতে যেখানে ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়ছবি: উইকিপিডিয়া
ওহুদ পাহাড়, ৩ হিজরিতে যেখানে ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ছবি: উইকিপিডিয়া

 

নাজরানের মানুষের জন্য যাঁকে বেছে নিয়েছিলেন নবীজি

আবু উবাইদা (রা.)-এর বিশ্বস্ততার সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় নাজরানের প্রতিনিধিদলকে ঘিরে একটি ঘটনায়। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, নাজরানের লোকেরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এসে তাঁদের জন্য একজন বিশ্বস্ত মানুষ পাঠানোর অনুরোধ করেন। তখন নবীজি (স.) বলেন, তিনি তাঁদের কাছে এমন একজনকে পাঠাবেন, যিনি সত্যিকার অর্থেই আমানতদার।

সাহাবিরা প্রত্যেকেই এই দায়িত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)-কেই নির্বাচন করেন। (সহিহ বুখারি: ৪৩৮১)

ঘটনাটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সততার স্বীকৃতি নয়, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দায়িত্ব দেওয়ার সময় যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও আমানত রক্ষার সক্ষমতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।

দায়িত্ব পালনে আপসহীন এক সেনাপতি

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের পর আবু উবাইদা (রা.) মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শাম অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে শাম অঞ্চলের বিভিন্ন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য আসে।

তবে তাঁর নেতৃত্বের পরিচয় শুধু সামরিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইতিহাসের বর্ণনাগুলোতে তাঁর ব্যক্তিগত সরলতা ও দায়িত্ববোধের কথাও পাওয়া যায়। ক্ষমতা ও মর্যাদার সঙ্গে বিলাসিতা জড়িয়ে না ফেলে তিনি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন বলে জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।

আরও পড়ুন: খন্দক যুদ্ধে অলৌকিক আহার: এক হাজার সাহাবিকে খাওয়ালেন রাসুল (স.)

নেতৃত্বের এই দিকটি তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। কারণ প্রকৃত নেতৃত্বের মূল্য শুধু কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করা হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা, মানুষের প্রতি আচরণ এবং ব্যক্তিগত জীবনে সততাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আবু উবাইদা (রা.)–এর সমাধি, দেইরে আল্লা সিটি, জর্ডানছবি: উইকিপিডিয়া
আবু উবাইদা (রা.)–এর সমাধি, দেইরে আল্লা সিটি, জর্ডান। ছবি: উইকিপিডিয়া

 

মহামারির সময়ও সঙ্গীদের ছেড়ে যাননি

হিজরি ১৮ সালে শাম অঞ্চলে আমওয়াসের মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষ মারা যান। আবু উবাইদা (রা.) তখন ওই অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা ওমর (রা.) তাঁকে মহামারিতে আক্রান্ত অঞ্চল থেকে নিরাপদ স্থানে চলে আসার জন্য চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু আবু উবাইদা (রা.) তাঁর অধীন মুসলিমদের ছেড়ে চলে যেতে চাননি। তিনি নিজেকে তাঁদের থেকে আলাদা করতে রাজি হননি।

এই ঘটনার বর্ণনায় তাঁর দায়িত্ববোধ ও সহযোদ্ধাদের প্রতি অঙ্গীকারের পরিচয় পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত তিনিও মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।

আরও পড়ুন: যে নারীর বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেছেন নবীজি

তাঁর মৃত্যুর ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। একজন দায়িত্বশীল নেতা নিজের নিরাপত্তার চেয়ে যাঁদের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে এই ঘটনাকে মহামারি মোকাবিলায় সতর্কতা অবলম্বন না করার শিক্ষা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইসলামে নিজের জীবন ও অন্যের জীবন রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

যে জীবন আমাদের জন্য শিক্ষা রেখে গেছে

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর জীবন থেকে আমরা সততা, আমানতদারি ও দায়িত্ব পালনের শিক্ষা পাই। তিনি নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন এবং মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। নবীজির দেওয়া ‘উম্মতের আমানতদার’ স্বীকৃতি অনেক বড় সম্মানের।

আমাদের জীবনেও অনেক দায়িত্ব থাকে। পরিবার, কর্মক্ষেত্র কিংবা ব্যবসা প্রতিটি জায়গায় মানুষের সঙ্গে বিশ্বস্ততার সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। কারও সম্পদ, গোপন কথা বা দেওয়া দায়িত্ব যেন আমাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। আবু উবাইদা (রা.)-এর জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মানুষের মনে জায়গা করে নিতে বড় পদ বা ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। সততা আর বিশ্বস্ততা দিয়েও মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করা যায়।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৩৭৪৪ ও ৪৩৮১