ধর্ম ডেস্ক
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম
মসজিদ আল্লাহর ঘর। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য মুসলিমরা এখানে সমবেত হন। তাই মসজিদের পরিবেশ শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ রাখা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। অপ্রয়োজনে উচ্চস্বরে কথা বলা, চেঁচামেচি করা কিংবা এমন শব্দ করা, যাতে অন্য মুসল্লিদের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটে- মসজিদের আদবের পরিপন্থী।
মসজিদের অন্যতম উদ্দেশ্য আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এ হলো আল্লাহর স্মরণ, নামাজ ও কোরআন পাঠের স্থান।’ (সহিহ মুসলিম: ২৮৫)
তাই মসজিদের পরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যেখানে মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে ইবাদত করতে পারেন। উচ্চস্বরে কথাবার্তা বা অপ্রয়োজনীয় কোলাহল সেই পরিবেশ নষ্ট করে।
হজরত ওমর (রা.) মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলার কারণে দুই ব্যক্তিকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি এই মদিনা শহরের বাসিন্দা হতে, তাহলে মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার কারণে আমি দুজনকেই কঠোর শাস্তি দিতাম।’ (সহিহ বুখারি: ৪৭০)
এ ঘটনা মসজিদের ভেতরে কথাবার্তা ও শব্দে সংযমের গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলা, তর্ক-বিতর্ক ও হৈচৈ মসজিদের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা আগ-পিছ হয়ে দাঁড়াবে না। তাহলে তোমাদের অন্তরে বৈপরিত্য সৃষ্টি হবে। সাবধান! তোমরা মসজিদে বাজারের ন্যায় শোরগোল করবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৬৭৫)
অর্থাৎ মসজিদে এমন আচরণ করা উচিত নয়, যাতে সেটি বাজারের মতো হৈচৈপূর্ণ পরিবেশে পরিণত হয়।
মসজিদে কথা বলাই নিষিদ্ধ নয়। প্রয়োজনীয় ও বৈধ কথা স্বাভাবিক স্বরে বলা যেতে পারে, যদি এতে অন্য মুসল্লির ইবাদতে ব্যাঘাত না ঘটে।
সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (স.) ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত তাঁর নামাজের স্থানে বসে থাকতেন। সাহাবিরা তখন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতেন, জাহেলি যুগের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতেন এবং হাসতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁদের কথা শুনে মুচকি হাসতেন। (সহিহ মুসলিম: ৬৭০)
তাই বৈধ প্রয়োজনের কথা বলতে হলে মসজিদের পরিবেশ ও আশপাশের মুসল্লিদের কথা বিবেচনায় রেখে স্বাভাবিক স্বরে কথা বলা উচিত। শুধু পার্থিব কথাবার্তা ও আড্ডার উদ্দেশ্যে মসজিদে আসা এবং সেখানে আসর জমানো মসজিদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মসজিদে নিজের ইবাদতের পাশাপাশি অন্য মুসল্লিদের ইবাদতের অধিকারও মনে রাখতে হবে। একজনের উচ্চস্বরে কথা বলা অন্যের নামাজের খুশু নষ্ট করতে পারে, কোরআন তেলাওয়াতে মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে কিংবা কারও বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এ কারণে অনেক আলেম উচ্চস্বরে জিকিরের ক্ষেত্রেও সতর্ক করেছেন। নামাজি, তেলাওয়াতকারী, ইতেকাফকারী বা ঘুমন্ত কারও ইবাদত বা বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটলে এমন উচ্চস্বরে জিকির করা উচিত নয়। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া: ৬৩৯)
ভালো কোনো কাজও এমনভাবে করা উচিত নয়, যাতে তার কারণে অন্য মুসল্লির ইবাদত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলার পাশাপাশি মোবাইল ফোনও শব্দদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফোনের রিংটোন, উচ্চস্বরে ফোনে কথা বলা কিংবা ভিডিও-অডিও চালানোর কারণে অন্য মুসল্লিদের নামাজ ও তেলাওয়াতে মনোযোগ নষ্ট হতে পারে।
তাই মসজিদে প্রবেশের আগে ফোন নীরব করে রাখা উচিত। জরুরি ফোন এলে সম্ভব হলে বাইরে গিয়ে কথা বলা ভালো। মসজিদের ভেতরে কথা বলতে হলে স্বর নিচু রাখা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় কথা না বলাই শোভন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তার চেয়ে অধিক জালিম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর মসজিদগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা দেয় এবং এগুলো বিরান করার চেষ্টা করে?’ (সুরা বাকারা: ১১৪)
আয়াতটি মসজিদে আল্লাহর নাম স্মরণে বাধা দেওয়ার ব্যাপারে কঠিন সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাই মসজিদের পরিবেশ নষ্ট করে এমন আচরণ থেকে প্রত্যেক মুসলিমের সতর্ক থাকা উচিত।
মসজিদে কথা বলা বৈধ হলেও অপ্রয়োজনীয় উচ্চস্বরে কথা বলা ও এমন কোলাহল করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা মসজিদের মর্যাদা নষ্ট করে বা অন্যের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায়। মসজিদের আদব হলো- নিজের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি অন্য মুসল্লিদের ইবাদতের পরিবেশও সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করা।