ধর্ম ডেস্ক
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম
কোরআন তেলাওয়াত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। এখন ছাপা মুসহাফের পাশাপাশি অনেকে মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারেও কোরআন পড়েন। ফলে তেলাওয়াতের মাঝখানে ফোনে কল, মেসেজ বা নোটিফিকেশন আসা অস্বাভাবিক নয়।
তখন প্রশ্ন ওঠে, তেলাওয়াত থামানো যাবে কি? ফোন ধরলে কি কোরআনের অসম্মান হবে? জরুরি কল এলে কী করবেন?
না। নামাজের বাইরে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করার পর বৈধ প্রয়োজনে তা থামানোকে গুনাহ বলা ঠিক নয়। একটানা চালিয়ে যেতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
আল্লাহ তাআলা তেলাওয়াত ধীরস্থির ও স্পষ্টভাবে করার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর কোরআন ধীরে ধীরে সুস্পষ্টভাবে পাঠ কর।’ (সুরা মুজজাম্মিল: ৪)
তবে অপ্রয়োজনে বারবার তেলাওয়াত থামিয়ে ফোন দেখা মনোযোগ ও আদবের সঙ্গে মানায় না। মূল বিচার্য বিষয় হলো- প্রয়োজন, পরিস্থিতি ও আচরণ।
প্রথমে রিংটোন বন্ধ করে দিন। আশপাশে কেউ কোরআন পড়লে বা শুনলে দ্রুত ফোন নীরব করা উচিত, যাতে তেলাওয়াতের পরিবেশ নষ্ট না হয়। ফোন নীরব করতে তেলাওয়াত সাময়িক থামাতে হলে দোষ নেই। এরপর কলটি জরুরি কি না, তা বিবেচনা করুন।
আরও পড়ুন: কোরআনের পৃষ্ঠা উল্টাতে থুতুর ব্যবহার জায়েজ?
জরুরি হলে তেলাওয়াত থামিয়ে ফোন ধরা জায়েজ। যেমন পরিবারের কেউ অসুস্থ, দুর্ঘটনার আশঙ্কা আছে, সন্তান বা স্বজনের জরুরি প্রয়োজন হতে পারে, কিংবা দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো কোনো দায়িত্ব আছে। এসব ক্ষেত্রে সংক্ষেপে কথা বলে প্রয়োজন মেটালে কোরআনের অসম্মান হয় না।
সম্ভব হলে কোনো আয়াত বা অর্থপূর্ণ জায়গায় থামা ভালো। এতে তেলাওয়াতের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তবে জরুরি অবস্থায় সেই জায়গা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, এমন নয়। যেখানে আছেন, সেখানেই থামতে পারেন। পরে সুযোগ হলে সেখান থেকেই আবার শুরু করা যায়।
সাধারণ কল, পরিচিতজনের সাধারণ কথা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশনের জন্য তেলাওয়াত থামানোর প্রয়োজন নেই। ফোন নীরব করে তেলাওয়াত চালিয়ে যান। তেলাওয়াতশেষে কল ফেরত দিন বা মেসেজ দেখুন।
মেসেজ, ই-মেইল ও অন্যান্য অ্যাপের সতর্কবার্তা সাধারণত জরুরি নয়। তাই এগুলো উপেক্ষা করাই ভালো।
তেলাওয়াত থামানো অসম্মান নয়। অসম্মান আসে আচরণ ও মানসিকতা থেকে। তাই মুসহাফ হাতে থাকলে সেটি যথাযথ জায়গায় রেখে ফোনের প্রয়োজনীয় কাজ সারুন। মুসহাফ অযত্নে রেখে দেওয়া বা কোরআনের প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়-এমন কাজে ব্যস্ত হওয়া এড়িয়ে চলুন।
আরও পড়ুন: আল্লাহর কাছে কোরআনের হাফেজের মর্যাদা
মোবাইলে কোরআন পড়লে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। কারণ একই ডিভাইসে কোরআন অ্যাপের পাশাপাশি ফোন, মেসেজ ও অন্যান্য অ্যাপ থাকে। কল এলে প্রয়োজনমতো অ্যাপ থেকে বের হয়ে ফোন ধরুন এবং পরে আবার কোরআন অ্যাপে ফিরে আসুন।
গান বা বাদ্যযন্ত্রযুক্ত রিংটোন না রাখাই উত্তম। কোরআনের আয়াত, আজান বা তেলাওয়াতকেও রিংটোন না বানানোই নিরাপদ। কারণ ফোন যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় বাজতে পারে। কখনো রিংটোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা কথার মাঝখানে কেটে যেতে পারে। কোরআনের আয়াত ও তেলাওয়াতকে এমন অনিশ্চিত ব্যবহারের মধ্যে না রাখাই শ্রদ্ধার পরিচয়। তাই সাধারণ ও নিরীহ রিংটোন ব্যবহার করা ভালো।
সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো তেলাওয়াতে বসার আগেই ফোন সাইলেন্ট বা ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে রাখা। মসজিদ, কোরআন শিক্ষা বা তেলাওয়াতের মজলিসে যাওয়ার আগে ফোন নীরব করাও শিষ্টাচারের অংশ।
কোরআন শোনার সময় মনোযোগ ও নীরবতার গুরুত্ব কোরআনেই এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়।’ (সুরা আরাফ: ২০৪)
তবে এ আয়াতের মূল প্রসঙ্গ কোরআন তেলাওয়াত শোনা। তাই ব্যক্তিগত তেলাওয়াত থামানো বা ফোন ধরার সরাসরি বিধান হিসেবে নয়, কোরআনের প্রতি মনোযোগ ও শ্রবণের আদবের সাধারণ নির্দেশ হিসেবে এটি দেখা উচিত।
এককথায়, কোরআন পড়ার সময় ফোন বেজে উঠলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আগে রিংটোন বন্ধ করুন। কলটি জরুরি হলে তেলাওয়াত থামিয়ে প্রয়োজনীয় সাড়া দিন। জরুরি না হলে ফোন নীরব করে তেলাওয়াতে ফিরে যান। কোরআনের প্রতি সম্মান মানে বৈধ প্রয়োজনেও থামা যাবে না, তা নয়। সম্মান হলো কোরআনকে গুরুত্ব দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে তেলাওয়াত করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
তথ্যসূত্র: সুরা মুজজাম্মিল: ৪; সুরা আরাফ: ২০৪