ধর্ম ডেস্ক
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
বর্তমান সময়ে যোগাযোগের অন্যতম সহজ মাধ্যম মেসেজ। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইমো কিংবা অন্যকোনো মাধ্যমে কেউ কিছু লিখলে অনেক সময় আমরা তা পড়ে রেখে দেই, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। কখনো ব্যস্ততার কারণে, কখনো ইচ্ছা না থাকায়, আবার কখনো ইচ্ছাকৃতভাবেই কাউকে ‘সিন’ করে রেখে দিই।
প্রশ্ন হলো, ইসলাম কি এভাবে কারও মেসেজের উত্তর না দেওয়াকে অন্যায় মনে করে?
এর উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। কারণ সব মেসেজের ধরন ও গুরুত্ব এক নয়। কোনো মেসেজের উত্তর দেওয়া দায়িত্বের অংশ হতে পারে, আবার কোনো মেসেজের উত্তর না দিলেও বিশেষ কোনো হক নষ্ট হয় না।
কেউ মেসেজে সালাম দিলে সেটিকে সাধারণ কথাবার্তার মতো দেখার সুযোগ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদেরকে যখন কোনো অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন দ্বারা তার জবাব দাও অথবা অনুরূপ জবাব দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা নিসা: ৮৬)
মুফাসসিরগণ এ আয়াতের আলোচনায় সালামের জবাব দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (স.)-ও একজন মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের অধিকারের মধ্যে সালামের জবাব দেওয়ার কথা বলেছেন। (সহিহ মুসলিম: ২১৬২)
তাই সালামের জবাব দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা এড়িয়ে যাওয়া সাধারণ মেসেজ উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। অন্তত ইসলামের আদব ও উত্তম আচরণের দিক থেকে সালামের জবাব দেওয়াই উচিত।
আরও পড়ুন: চিঠি বা মেইলে কেউ সালাম দিলে জবাব দেয়ার নিয়ম কী
না। ইসলামে এমন কোনো সাধারণ বিধান নেই যে, কেউ মেসেজ পাঠালেই তার উত্তর দেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ হয়ে যাবে।
কেউ হয়তো শুধু একটি তথ্য পাঠালেন, শুভেচ্ছা জানালেন, এমন কিছু বললেন যার জবাব প্রত্যাশিত নয়, অথবা এমন বিষয়ে লিখলেন যার উত্তর না দিলেও তাঁর কোনো হক নষ্ট হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে উত্তর না দিলেই গুনাহ হয়েছে, এমন মনে করার কারণ নেই।
তবে ইসলাম মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে উৎসাহিত করেছে। তাই উত্তর দেওয়া সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও কাউকে বারবার উপেক্ষা করা উত্তম আখলাকের পরিচয় নয়।
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন মেসেজটি কারও প্রয়োজন, অধিকার বা দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
ধরুন, কেউ আপনার কাছে জরুরি পরামর্শ চেয়েছেন। কোনো কর্মী কাজের নির্দেশনা জানতে চেয়েছেন। পরিবারের কেউ প্রয়োজনের কথা জানিয়েছেন। অথবা এমন কেউ সাহায্য চেয়েছেন, যার সহযোগিতা করা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এ ধরনের মেসেজ পড়ে জেনেশুনে উত্তর না দিয়ে রাখা পরিস্থিতিভেদে অন্যায় হতে পারে। কারণ তখন বিষয়টি শুধু ‘মেসেজের উত্তর’ নয়, কারও প্রয়োজন বা অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)
আরও পড়ুন: জবাবদিহির ব্যাপারে ইসলামের সতর্কতা
এ ক্ষেত্রে নীরবতা আরেকটি সমস্যাও তৈরি করে: অপর ব্যক্তি অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। কেউ হয়তো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আপনার উত্তরের অপেক্ষায় আছেন। মেসেজটি আপনি দেখেছেন, কিন্তু উত্তর দেবেন কি না, তিনি জানেন না। দীর্ঘ নীরবতার কারণে তার কাজে সমস্যা, আর্থিক ক্ষতি বা অযথা দুশ্চিন্তা তৈরি হলে বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
কখনো উত্তর না দেওয়ার উদ্দেশ্য হয় অপর ব্যক্তিকে বোঝানো, ‘তোমাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না।’ কখনো আবার রাগ করে শাস্তি দিতে বা সম্পর্ক নষ্ট করতে নীরব থাকা হয়। ব্যস্ততার কারণে উত্তর দিতে না পারা আর এ ধরনের ইচ্ছাকৃত নীরবতা এক বিষয় নয়। কারণ তখন সমস্যা শুধু উত্তর না দেওয়ায় নয়, মানুষকে হেয় করা বা কষ্ট দেওয়ার মানসিকতায়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ।’ (সহিহ বুখারি: ১০)
তিনি আরও বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি বর্জন করা বৈধ নয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৭৬; সহিহ মুসলিম: ২৫৬০)
অবশ্য একটি মেসেজের উত্তর না দেওয়াকে সরাসরি এই দুই হাদিসের আওতায় এনে গুনাহের ফতোয়া দেওয়া ঠিক নয়। দ্বিতীয় হাদিসটি মূলত পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন ও বর্জনের বিষয়ে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে অপমান করা, কষ্ট দেওয়া বা অকারণে সম্পর্ক নষ্ট করার মানসিকতা যে ইসলামের উত্তম চরিত্রের সঙ্গে যায় না, হাদিস দুটি সে বিষয়ে সতর্ক করে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম: ৪৭)
তাই কোনো মেসেজের উত্তর দিলে যদি অনর্থক বিতর্ক বাড়ে, গুনাহের কথা বলতে হয়, কারও গিবত হয় বা ঝগড়া তৈরি হয়, তখন উত্তর না দেওয়াই উত্তম হতে পারে।
একইভাবে অশোভন, হয়রানিমূলক, ক্ষতিকর বা গুনাহের দিকে আহ্বানকারী বার্তার প্রতিটি কথার উত্তর দেওয়া জরুরি নয়। নিজের নিরাপত্তা, সময় ও ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষা করা বৈধ। প্রয়োজনে যোগাযোগ সীমিত করা বা বন্ধ করাও যেতে পারে।
সব মেসেজের উত্তর দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই নীরবে উপেক্ষা করার পরিবর্তে সম্ভব হলে সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র উত্তর দেওয়া উত্তম। যেমন- ‘এখন ব্যস্ত আছি, পরে জানাচ্ছি’, ‘এই মুহূর্তে কথা বলার সুযোগ নেই’ অথবা ‘দুঃখিত, বিষয়টি নিয়ে আমি সাহায্য করতে পারছি না।’
কারণ একটি ছোট্ট মেসেজের উত্তর কখনো শুধু একটি কথার জবাব নয়। এর মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আমাদের সম্মান, দায়িত্ববোধ ও আখলাক।