Dhaka Mail Logo

ইসলাম

রিজিক বাড়ানোর নামে প্রচলিত কিছু আমল

ধর্ম ডেস্ক

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

রিজিকের সংকট থেকে মুক্তি ও বরকতের আশায় মানুষ বিভিন্ন আমল করে থাকেন। এর মধ্যে কিছু আমল কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে প্রমাণিত। আবার এমন কিছু আমলও সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত, যেগুলোর পক্ষে শরিয়তে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। এসব আমলকে কখনো কখনো ‘পরীক্ষিত’ বা ‘নিশ্চিত ফলদায়ক’ বলেও প্রচার করা হয়।

কোরআন-হাদিসে দোয়া, ইস্তেগফার, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, শুকরিয়া ও নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো আমলের সঙ্গে নির্দিষ্ট পার্থিব ফলাফল যুক্ত করতে হলে তার পক্ষে শরিয়তের দলিল থাকা জরুরি।

নির্দিষ্ট সংখ্যা-সময় বেঁধে দেওয়া আমল

রিজিক বাড়ানোর জন্য কোনো সুরা বা আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়া, কোনো জিকির নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্টবার পাঠ করলে অর্থের অভাব দূর হবে-এমন কথা সমাজে প্রচলিত। কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়া অবশ্যই নেক আমল। তবে শরিয়তে নির্ধারিত নয় এমন সংখ্যা বা সময়কে রিজিক বৃদ্ধির বিশেষ পদ্ধতি হিসেবে বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কোনো ওয়াজিফাকে ‘সুন্নত’ বা ‘নিশ্চিত রিজিক বৃদ্ধির আমল’ বলে প্রচার করার আগে তার দলিল যাচাই করা জরুরি। কারো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকলেও সেটিকে সবার জন্য শরিয়ত-নির্ধারিত আমল হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। কোনো আমলের সাধারণ ফজিলত থাকা আর তার সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট পার্থিব ফল জুড়ে দেওয়া- এ দুটো এক বিষয় নয়।

আরও পড়ুন: দেশে প্রচলিত ১১ বিদআত ও ভিত্তিহীন প্রথা: ইসলামের নির্দেশনা

তাবিজ-কবচ বা বিশেষ বস্তুর ওপর নির্ভরতা

রিজিক বৃদ্ধি বা অর্থের বরকতের আশায় তাবিজ, নির্দিষ্ট পাথর বা বিশেষ কোনো বস্তু ব্যবহারের প্রচলনও কোথাও কোথাও দেখা যায়। কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় রিজিক এনে দিতে পারে-এমন বিশ্বাস ইসলামের তাওহিদের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ।

তাবিজের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে কোরআনের আয়াতযুক্ত তাবিজের ক্ষেত্রে। তাই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের মতামত অনুসরণ করা উচিত। তবে কোনো বস্তুকে নিজস্ব ক্ষমতার অধিকারী মনে করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

দুর্বল বর্ণনাকে সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার

ইস্তেগফারের সঙ্গে রিজিকের সম্পর্ক নিয়ে একটি বহুল প্রচারিত বর্ণনায় বলা হয়, নিয়মিত ইস্তেগফারকারীকে আল্লাহ সংকট থেকে উত্তরণের পথ করে দেন এবং অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিজিক দেন। বর্ণনাটি সুনানে আবু দাউদে (হাদিস: ১৫১৮) রয়েছে। তবে মুহাদ্দিসদের একাংশের মূল্যায়নে এর সনদ দুর্বল। তাই এটিকে সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করা সংগত নয়।

তবে এতে ইস্তেগফারের গুরুত্ব কমে না। এর সঙ্গে রিজিক ও পার্থিব কল্যাণের সম্পর্ক কোরআনেই এসেছে। হজরত নুহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদী-নালা সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা নুহ: ১০-১২)

আমল করলেই নির্দিষ্ট অর্থ পাওয়ার ধারণা

কোনো আমল করলেই অল্প সময়ে নির্দিষ্ট অর্থ আসবে, ব্যবসায় লাভ হবে বা চাকরি হবে-এমন ধারণা প্রচলিত। ইবাদতের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পার্থিব ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা ইসলামে নেই।

আল্লাহ চাইলে কোনো আমলের মাধ্যমে বান্দার রিজিকে বরকত দিতে পারেন। আবার তাঁর হেকমত অনুযায়ী রিজিকের ধরন ও সময় ভিন্নও হতে পারে। তাই কোনো আমলকে নির্দিষ্ট পার্থিব ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

আরও পড়ুন: আশুরার সঠিক ইতিহাস কী? সহিহ ও জাল বর্ণনার বিশ্লেষণ

চেষ্টা ছাড়া শুধু আমলের ধারণাও ঠিক নয়

রিজিকের জন্য দোয়া ও আমলের পাশাপাশি হালাল পথে চেষ্টা করাও ইসলামের শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (স.) তাওয়াক্কুলের উদাহরণ দিতে পাখির কথা বলেছেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরে আসে। (জামে তিরমিজি: ২৩৪৪)

অর্থাৎ তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বৈধ উপায়ে রিজিকের সন্ধান করাও বান্দার দায়িত্ব।

কোরআন-হাদিসে যেসব আমলের কথা এসেছে

প্রচলিত এসব আমলের পাশাপাশি কোরআন-হাদিসে রিজিক ও বরকতের সঙ্গে যেসব আমলের সম্পর্ক পাওয়া যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-

তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল: আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক: ২-৩)

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করা হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৫)

দান-সদকা: আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার প্রতিদান দেবেন। তিনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সুরা সাবা: ৩৯)

শুকরিয়া আদায়: আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)

হালাল পথে চেষ্টা: আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।’ (সুরা জুমুআ: ১০)

এসবের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা, বেশি বেশি নেক আমল করাও একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মূল কথা

রিজিক বাড়ানোর নামে কোনো আমল প্রচলিত থাকলেই সেটিকে নির্ধারিত আমল মনে করা ঠিক নয়। বিশেষ করে কোনো আমলের সঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময় বা নিশ্চিত পার্থিব ফলাফল যুক্ত থাকলে তার দলিল যাচাই করা জরুরি।

কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, ইস্তেগফার ও দোয়া নেক আমল। তবে এসবের সঙ্গে শরিয়তে প্রমাণিত নয় এমন নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা ফলাফল যুক্ত করে প্রচার করা থেকে সতর্ক থাকা উচিত। রিজিকের মালিক আল্লাহ। বান্দার দায়িত্ব হলো তাঁর ওপর ভরসা করা, হালাল পথে চেষ্টা করা, নেক আমল করা এবং তাঁর কাছে দোয়া করা।

তথ্যসূত্র: সুরা নুহ: ১০-১২; সুরা তালাক: ২-৩; সুরা সাবা: ৩৯; সুরা ইবরাহিম: ৭; সুরা জুমুআ: ১০; সহিহ বুখারি: ৫৯৮৫; জামে তিরমিজি: ২৩৪৪; আবু দাউদ: ১৫১৮