ধর্ম ডেস্ক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
তাবিজ নিয়ে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন হলো- এতে যদি কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা মাসনুন দোয়া লেখা থাকে, তাহলে কি সেটি জায়েজ হয়ে যায়? বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই কোরআনের আয়াত লেখা থাকলেই তাবিজকে নিঃশর্তভাবে জায়েজ বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদের বিষয়টিও উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
সাধারণভাবে তাবিজ বলতে এমন কিছু বোঝায়, যা রোগ, বদনজর, জ্বিনের অনিষ্ট বা বিপদ থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে শরীরে ঝুলিয়ে বা বেঁধে রাখা হয়। কাগজ, কাপড়, ধাতব বস্তু কিংবা অন্যকোনো পাত্রে কিছু লিখে তা ধারণ করার প্রচলন রয়েছে।
তাবিজ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁক, তাবিজ ও তিওয়ালা (ভালোবাসা বা আকর্ষণ সৃষ্টির মন্ত্র) শিরক।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৮৩)
হাদিসে তাবিজের ব্যাপারে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তবে কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা বৈধ দোয়া লেখা তাবিজ এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত কি না-এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আরও পড়ুন: তাবিজ ব্যবহার: ইসলামি বিধান ও সতর্কতা
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে প্রধানত দুটি মত পাওয়া যায়।
একদল আলেম কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা হাদিসে বর্ণিত বৈধ দোয়া লেখা তাবিজকে শর্তসাপেক্ষে জায়েজ বলেছেন। তাঁদের মতে, তাবিজে শরিয়তসম্মত বক্তব্য থাকলে এবং এটিকে স্বাধীনভাবে কার্যকর মনে না করলে ওসিলা হিসেবে তা ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই মতের পক্ষে সাহাবিদের আমল থেকেও একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়। আমর ইবনু শুআইব (রহ.) তাঁর বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) ভয় বা আতঙ্কের সময় পড়ার জন্য একটি দোয়া শিক্ষা দিতেন। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) তাঁর সন্তানদের তা শেখাতেন। আর যারা ছোট ছিল এবং বুঝে পড়তে পারত না, তাদের জন্য তিনি তা লিখে গলায় ঝুলিয়ে দিতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৯৩)
এ ছাড়া হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ কোরআন বা আল্লাহর নামসম্বলিত মুআউয়িযাত ব্যবহারের অনুমতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে অনেক আলেম কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজও নিষিদ্ধ মনে করেন। তাঁদের মতে, তাবিজ নিষেধের হাদিসগুলো সাধারণ অর্থবোধক এবং কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজকে আলাদাভাবে বৈধ ঘোষণা করে এমন স্পষ্ট দলিল নেই। এ ছাড়া তাবিজ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের অন্তর কোনো বস্তুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
শায়খ ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়াতেও কোরআনের আয়াত বা বৈধ দোয়া লেখা তাবিজের বিষয়ে আলেমদের মতভেদের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে তিনি তাবিজ নিষেধের সাধারণ হাদিস এবং শিরকের পথ বন্ধ করার যুক্তিতে কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজও নিষিদ্ধ মত গ্রহণ করেছেন।
তাই ‘তাবিজে কোরআনের আয়াত আছে, তাই এটি অবশ্যই জায়েজ’-এমন সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত নয়।
আরও পড়ুন: কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজ নিয়ে টয়লেটে যাওয়া যাবে?
কোরআনের আয়াত বা বৈধ দোয়া লেখা তাবিজকে যারা জায়েজ বলেছেন, তাঁরাও সাধারণত কিছু শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। তাবিজে কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা অর্থবোধক বৈধ দোয়া থাকতে হবে। এতে শিরকি বাক্য, অজানা শব্দ, অর্থহীন চিহ্ন বা অস্পষ্ট মন্ত্র থাকা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আকিদা। তাবিজ নিজে থেকে কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে-এমন বিশ্বাস করা যাবে না। উপকার ও ক্ষতির প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। তাবিজকে স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করা তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রুকইয়ার ক্ষেত্রেও আলেমরা একই মূলনীতির কথা উল্লেখ করেছেন যে কোরআন, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি কিংবা অর্থবোধক বৈধ দোয়ার মাধ্যমে রুকইয়া করা হলে বিশ্বাস রাখতে হবে যে এর নিজস্ব কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই, আল্লাহর ইচ্ছাতেই উপকার হয়।
কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজ নিষিদ্ধ বলার ক্ষেত্রে আলেমরা মূলত তাবিজ নিষেধের হাদিসগুলোর সাধারণ বক্তব্যকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে, হাদিসে কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজের জন্য কোনো স্পষ্ট ব্যতিক্রম উল্লেখ নেই।
আরও পড়ুন: কেউ জাদু করেছে কি না বুঝবেন কীভাবে
তাঁরা আরও বলেন, কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজ অনুমোদন করা হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে কোরআনি তাবিজ ও শিরকি মন্ত্রযুক্ত তাবিজের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে। ফলে তাবিজ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কোরআন পড়ে কারও ওপর ফুঁ দেওয়া এবং কোরআনের আয়াত লিখে কোনো বস্তু শরীরে ঝুলিয়ে দেওয়া একই বিষয় নয়।
কোরআনের আয়াত ও মাসনুন দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আরোগ্য ও সুরক্ষা চাওয়াকে রুকইয়া বলা হয়। শরিয়তসম্মত রুকইয়ার বৈধতা হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে রুকইয়া করেছেন এবং শিরকমুক্ত রুকইয়ার অনুমতিও দিয়েছেন।
তবে তাবিজের নিষেধাজ্ঞার হাদিসে ‘রুকইয়া’ শব্দও এসেছে। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে নিষিদ্ধ রুকইয়া বলতে শিরকি, অজানা বা শরিয়তবিরোধী ঝাড়ফুঁক বোঝানো হয়েছে। কোরআন ও বৈধ দোয়ার মাধ্যমে রুকইয়া এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
অন্যদিকে কোরআনের আয়াত লিখে তা শরীরে ঝুলিয়ে রাখা তাবিজের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে কোরআন পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়াকে তাবিজ ব্যবহারের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
তাবিজের বিধান নিয়ে যেহেতু আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তাই কী আমল করবেন, সে বিষয়ে বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী আলেমের কাছ থেকে নিজের অনুসৃত ফিকহ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দিকনির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক দোয়া, জিকির ও শরিয়তসম্মত রুকইয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা ও আরোগ্য চাওয়া যায়।
অতএব, তাবিজে কোরআনের আয়াত বা বৈধ দোয়া থাকলেই তা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ নয়। কিছু আলেম শর্তসাপেক্ষে তা জায়েজ বলেছেন। তবে কোরআন তেলাওয়াত, মাসনুন দোয়া, জিকির ও শরিয়তসম্মত রুকইয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা ও আরোগ্য চাওয়া স্বীকৃত আমল।
তথ্যসূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৮৩, ৩৮৯৩; মুসনাদে আহমাদ; আত-তামহিদ; রদ্দুল মুহতার; ফতোয়া নূরুন আলাদ্দারব-তাবিজ ও রুকইয়ার বিধান।