ধর্ম ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম
মানুষ সাধারণত এমনভাবে জীবন সাজায়, যেন তার সামনে অফুরন্ত সময় পড়ে আছে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, সম্পদ অর্জন, ক্যারিয়ার ও নানা স্বপ্নের ব্যস্ততায় জীবনের অনিবার্য সত্য- মৃত্যুর কথা অনেক সময় মন থেকে দূরে সরে যায়। অথচ ইসলাম মৃত্যুকে স্মরণ করতে বলেছে। প্রশ্ন হলো, এই স্মরণ কি জীবনকে বিষণ্ন করে দেয়, নাকি জীবনের প্রতি আরও সচেতন করে তোলে?
ইসলামের শিক্ষা হলো, মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে জীবন থেকে বিমুখ করার জন্য নয়, জীবনের উদ্দেশ্য ও পরিণতি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা অধিক পরিমাণে স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে স্মরণ করো।’ (জামে তিরমিজি: ২৩০৭)
মৃত্যুর স্মরণ দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা ও ভোগ-বিলাসকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করার প্রবণতা কমায়। মানুষ তখন বুঝতে পারে, যা নিয়ে এত ব্যস্ততা, তার সবই একদিন ছেড়ে যেতে হবে।
আরও পড়ুন: মৃত্যুর আগে কী কী লক্ষণ দেখা যেতে পারে
মৃত্যু অনিবার্য-এই উপলব্ধি মানুষকে নিজের কাজের হিসাব নিয়ে ভাবতে শেখায়। অন্যায় বা পাপের পথে যাওয়ার আগে সে মনে করতে পারে, একদিন এসব কাজের জবাব দিতে হবে।
আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কেয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পূর্ণরূপে দেওয়া হবে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৮৫)
তাই মৃত্যুর স্মরণ তাওবা, আত্মসংশোধন ও ভালো আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।
জীবনের সময় সীমিত-এই উপলব্ধি মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়। পরিবারকে সময় দেওয়া, দায়িত্ব পালন, ইবাদত করা কিংবা মানুষের উপকার করার সুযোগ তখন নতুন গুরুত্ব পায়।
মৃত্যুর স্মরণ তাই জীবনের দৈর্ঘ্য নিয়ে নয়, জীবনের ব্যবহার নিয়ে ভাবতে শেখায়।
মৃত্যুর কথা মনে রাখা আর মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে থাকা এক বিষয় নয়। একজন মুমিন মৃত্যুর অনিবার্যতা মনে রাখবেন, একই সঙ্গে আল্লাহর রহমতের আশাও রাখবেন।
আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার: ৫৩)
তাই ‘একদিন মরতেই হবে, জীবনের আর কোনো অর্থ নেই’ এমন চিন্তা ইসলামের শিক্ষা নয়। মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে হতাশ করার পরিবর্তে সংশোধনের প্রেরণা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুন: মৃত্যু আসার আগে ১১টি কাজ দ্রুত শেষ করুন
মৃত্যুর স্মরণ মানে চাকরি, ব্যবসা, পরিবার বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছেড়ে দেওয়া নয়। ইসলাম দুনিয়ার বৈধ প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আখেরাতের প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা কাসাস: ৭৭)
অর্থাৎ একজন মুসলিম হালাল জীবিকার চেষ্টা করবেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন এবং একই সঙ্গে আখেরাতের জন্য প্রস্তুত হবেন।
জীবনের ব্যর্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা কোনো কঠিন পরিস্থিতি মানুষকে ভেঙে দিতে পারে। মৃত্যুর স্মরণ তখন মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার কোনো অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। এতে সমস্যা অস্বীকার করার শিক্ষা নেই। আছে কষ্টের মধ্যেও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখার শিক্ষা।
একইভাবে এই স্মরণ অহংকার কমায়। সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদা নিয়ে গর্ব করার আগে মানুষ মনে করতে পারে- একদিন এসব ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে। ফলে মানুষের অধিকার, ভালো আচরণ ও সৎ আমলের গুরুত্ব বাড়ে।
মৃত্যুর স্মরণ জীবন থেকে বিমুখ করে না, বরং পাপ থেকে ফিরে সঠিকভাবে বাঁচতে শেখায়। মৃত্যুকে মনে রেখে বাঁচা মানে, প্রতিটি মুহূর্তকে আরও সচেতন ও অর্থবহ করে তোলা।
তথ্যসূত্র: জামে তিরমিজি: ২৩০৭, সুরা আলে ইমরান: ১৮৫, সুরা জুমার: ৫৩, সুরা কাসাস: ৭৭