নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম
টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থীদের প্রবেশ ও কার্যক্রম বন্ধ, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং আগের সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল রাখাসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় আয়োজিত সংগঠনটির সম্মেলন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সম্মেলনে দেশের ৬৪ জেলা থেকে ওলামায়ে কেরাম, মাশায়েখ, কওমি মাদ্রাসার শীর্ষস্থানীয় আলেম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ, তাবলিগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় বিচারহীনতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে।
সম্মেলন থেকে ঘোষিত আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার: টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে হবে। এ-সংক্রান্ত জিআর ও অন্যান্য মামলার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার দাবি জানানো হয়।
২. প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও শাস্তি: নিহত ও আহতদের বিষয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. অপরাধীদের কোনো ছাড় নয়: হত্যাকাণ্ড বা সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তি যে পক্ষেরই হোক, তাকে ছাড় না দিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

৪. আগের সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল: টঙ্গী ইজতেমা ময়দান ব্যবহারের বিষয়ে পূর্ববর্তী সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে হবে। সাদপন্থীদের সেখানে ইজতেমা বা তাবলিগের কোনো কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
৫. প্রবেশ ও কর্মসূচি বন্ধ: সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাদপন্থীরা ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ বা কোনো কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
৬. কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি বিদেশি নাগরিক ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থীদের কার্যক্রমের পক্ষে আবেদন করার আহ্বান এবং ওলামায়ে কেরাম সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ওয়াসিফুল ইসলাম, রেজা আরিফ, ওসামা ও সায়েমের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
৭. আলেমদের পরামর্শে স্থায়ী সমাধান: দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখ ও মুফতিয়ানে কেরামের পরামর্শের ভিত্তিতে দাওয়াত ও তাবলিগের চলমান সমস্যার স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
৮. বিচক্ষণতার সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্ত: দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, দ্বীনি পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারকে বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দাওয়াত ও তাবলিগের বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখদের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। লিখিত বক্তব্যে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের টঙ্গীর হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কোনো সংঘাত বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীকে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে বিশ্ব ইজতেমা শুরায়ী নিজামের অধীনে আলেমদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা এবং কাকরাইল মারকাজের কার্যক্রমও ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিভিন্ন বক্তব্য ও ধর্মীয় বিষয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে ওলামায়ে কেরামের আপত্তির কথা তুলে ধরা হয়। তাঁকে সংশোধনের জন্য দারুল উলুম দেওবন্দের মুরব্বিসহ বিভিন্ন আলেমের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে, তিনি তওবা করে দেওবন্দের মুরব্বিদের কাছে রুজু না করা পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, দাওয়াত ও তাবলিগ একটি দ্বীনি মেহনত। এ সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। দেশের লক্ষ লক্ষ ওলামা-মাশায়েখ, ছাত্র-জনতা ও তাবলিগের সাথীদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সম্মেলনে উপস্থিত ওলামা-মাশায়েখরা বলেন, তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে না নিলে দ্বীন রক্ষা ও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।
মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান জানান, সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকার শীর্ষস্থানীয় আলেম ও মাশায়েখ বক্তব্য দেন। সম্মেলনে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মাওলানা নাজমুল হোসাইন কাসেমী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মুফতি কেফায়েত উল্লাহ আজহারী ও মাওলানা লোকমান মাজহারী।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, আল্লামা ওবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা শায়খ সাজিদুর রহমান, মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরী, মুফতি জসিম উদ্দিন হাটহাজারী, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুছ ফরিদাবাদ, মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী, মাওলানা আব্দুল আউয়াল নারায়ণগঞ্জ, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী, মাওলানা ইকরাম হুসাইন ওয়াদুদী পটিয়া, মাওলানা শাব্বির আহমদ রশীদ কিশোরগঞ্জ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী ময়মনসিংহ, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা খুবাইব বিন তৈয়ব জিরি, মাওলানা ফয়জুল্লাহ মাদানী নগর, মাওলানা আনোয়ারুল করীম যশোর, মাওলানা আবদুল হক হক্কানি বগুড়া, মাওলানা মুশতাক আহমদ খুলনা, মাওলানা আবদুল হালিম বরিশাল, মুফতি মুহাম্মদ আলী আফতাবনগর, মাওলানা আব্দুল বাসেত খান, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজি লালবাগ, মাওলানা নিজামুদ্দিন নোয়াখালী, মাওলানা লেহাজ উদ্দিন গাজীপুর, মাওলানা নিয়ামাতুল্লাহ আল ফরিদী, মাওলানা কামরুজ্জামান ফরিদপুর, মুফতি বশিরুল্লাহ মাদানীনগর, মুফতি জাবের কাসেমী, মাওলানা নজরুল ইসলাম সিরাজগঞ্জ, মুফতি নুরুল্লাহ বরিশাল, মাওলানা আব্দুল হামিদ কুষ্টিয়া, মাওলানা সাঈদ নূর মানিকগঞ্জ এবং মাওলানা আবু বকর শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার আলেম ও মাশায়েখ।
সম্মেলন শেষে দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও দ্বীনের সঠিক মেহনতের জন্য দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের আবেগে প্রভাবিত না হয়ে দেশের বৃহৎ আলেম সমাজের মতামত বিবেচনায় নিয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
জেবি