ধর্ম ডেস্ক
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
কোনো প্রিয়জন দীর্ঘদিন কোমায় বা অচেতন অবস্থায় থাকলে পরিবারের মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন আসে- এই সময়ে তার নামাজ-রোজা ছুটে গেলে কি গুনাহ লেখা হচ্ছে? তার আমলনামায় কি কোনো আমল লেখা হচ্ছে? অসুস্থতার কারণে তার আগের নেক আমলগুলোর কী হবে? ইসলামি শরিয়তের বিভিন্ন দলিল ও ফকিহদের ব্যাখ্যার আলোকে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যায়।
ইসলামি শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি হলো- যে ব্যক্তির জ্ঞান-বুদ্ধি এমনভাবে লোপ পায় যে তিনি নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকেন না, সে অবস্থায় তার ওপর শরিয়তের বিধানের দায় থাকে না। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়, নাবালক শিশু, যতক্ষণ না সে বালেগ হয় এবং পাগল, যতক্ষণ না তার বিবেক ফিরে আসে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩; জামে তিরমিজি: ১৪২৩)
কোমায় থাকা ব্যক্তি সাধারণত এমন অবস্থায় থাকেন, যেখানে স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তি কার্যকর থাকে না। এ কারণে ফকিহরা অচেতন অবস্থার ক্ষেত্রে ‘কলম উঠিয়ে নেওয়া’র এই মূলনীতি প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করে নামাজ ছেড়ে দিচ্ছেন-এমনটি ধরা হবে না। তার অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতার কারণে সে সময়ের জন্য তিনি শরিয়তের আমল পালনের দায় থেকে অব্যাহতি পান।
আরও পড়ুন: যে আমলের মর্যাদা জান্নাতের ফলবাগানে অবস্থানের মতো
কোমায় থাকা অবস্থায় ব্যক্তি নামাজ বা রোজা আদায় করতে না পারলে এ কারণে তাকে গুনাহগার বলা হবে না। কারণ তিনি সচেতনভাবে ফরজ ইবাদত ত্যাগ করছেন না এবং সে অবস্থায় ইবাদত পালনের সক্ষমতাও তার থাকে না।
তবে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ওই সময়ে ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা করতে হবে কি না-এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, অচেতনতা এক দিন-রাতের বেশি স্থায়ী হলে ওই সময়ের ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা আবশ্যক হয় না। অন্যকিছু আলেম এ ক্ষেত্রে কাজা আদায়ের মত দিয়েছেন। তাই দীর্ঘ সময় কোমায় থাকার পর জ্ঞান ফিরে পাওয়া ব্যক্তির জন্য নিজের মাজহাব ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
অসুস্থতার কারণে আমল করতে না পারলেও একজন মুমিন তার আগের নিয়মিত নেক আমলের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হন না- হাদিসে এর সুসংবাদ রয়েছে। আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো বান্দা যখন অসুস্থ হয় বা সফরে বের হয়, তখন তার জন্য তা-ই লেখা হয়, যা সে সুস্থ ও ঘরে অবস্থানকালে আমল করত।’ (সহিহ বুখারি: ২৯৯৬)
তাই কেউ যদি অসুস্থ হওয়ার আগে নিয়মিত নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, সদকা বা অন্যকোনো নেক আমলে অভ্যস্ত থাকেন, অসুস্থতার কারণে তা করতে না পারলেও তার আগের নিয়মিত আমলের সওয়াব লেখা হতে থাকে। এটি অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বড় সান্ত্বনার বিষয়, আমল করার সক্ষমতা হারিয়ে গেলেও আল্লাহর কাছে তার আগের নেক আমল মূল্যহীন হয়ে যায় না।
আরও পড়ুন: কোরআন বিতরণসহ ১১ আমলের সওয়াব মৃত্যুর পরও জারি থাকে
অসুস্থতার কারণে একজন মুমিন যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যান, সেটিও তার জন্য কল্যাণের কারণ হয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমকে যে ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা মানসিক পীড়া স্পর্শ করে, এমনকি কাঁটার খোঁচাও; আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩)
তাই দীর্ঘ অসুস্থতা ও কষ্টকে শুধু দুর্ভোগ হিসেবে দেখার কারণ নেই। একজন মুমিনের জন্য ধৈর্যের সঙ্গে এই কষ্ট সহ্য করাও গুনাহ মোচনের কারণ হয়।
কোমায় থাকা রোগীর পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা, তার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া। রাসুলুল্লাহ (স.) অসুস্থ ব্যক্তির জন্য শিফার দোয়া করেছেন এবং অসুস্থদের জন্য দোয়া করতে উৎসাহিত করেছেন। তাই পরিবারের সদস্যরা রোগীর জন্য আল্লাহর কাছে শিফা, রহমত ও কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারেন। (জামে তিরমিজি: ২০৮৩)
রোগীর পক্ষ থেকে সদকা করার বিষয়টিও আলেমদের কাছে স্বীকৃত। বিশেষ করে কেউ জীবিত অবস্থায় কোনো সদকার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকলে তার বাস্তবায়নের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচ্য। তবে রোগীর পক্ষ থেকে কোরআন তেলাওয়াত করে এর সওয়াব তাকে পৌঁছে দেওয়া নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই এ বিষয়ে কোনো একটি মতকে সর্বসম্মত ইসলামি বিধান হিসেবে উপস্থাপন না করে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, কোমা সাধারণ ঘুমের মতো নয়। কোমার মাত্রা, স্থায়িত্ব এবং রোগীর জ্ঞান-বুদ্ধির অবস্থা একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট রোগীর নামাজ, রোজা বা পরবর্তী সময়ে কাজা সংক্রান্ত বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার প্রকৃত শারীরিক ও মানসিক অবস্থা জানা প্রয়োজন। এ জন্য চিকিৎসকের কাছ থেকে রোগীর অবস্থা জেনে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। সাময়িক অচেতনতা, দীর্ঘস্থায়ী কোমা এবং জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পরের অবস্থা সবগুলোকে এক নিয়মে দেখা ঠিক নয়।
কোমায় থাকা ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ ইবাদত ছেড়ে দিচ্ছেন না, তাই এ কারণে তিনি গুনাহগার হবেন না। অসুস্থতার আগে নিয়মিত নেক আমল থাকলে আল্লাহর রহমতে তার সওয়াব অব্যাহত থাকতে পারে। পরিবারের উচিত দোয়া, ধৈর্য ও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। এ কঠিন সময়ও একজন মুমিনের জন্য গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩; জামে তিরমিজি: ১৪২৩, ২০৮৩; সহিহ বুখারি: ২৯৯৬, ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩