ধর্ম ডেস্ক
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম
ইসলাম মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণের শিক্ষা দিয়েছে। একইসঙ্গে এমন কিছু স্বভাব ও আচরণ থেকে সতর্ক করেছে, যা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে কোনো একটি ঘটনার ভিত্তিতে কাউকে ভালো বা খারাপ হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। মানুষের ধারাবাহিক আচরণ ও পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। নিচে এমন ৭ ধরনের মানুষের পরিচয় তুলে ধরা হলো, যাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা ইসলামের শিক্ষা।
সুখের সময়ে পাশে থাকা সহজ। বিপদে মানুষের জন্য এগিয়ে আসা কঠিন। অথচ ইসলাম বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘব করাকে বড় নেক আমল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক।’ (সুরা তাওবা: ৭১)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)
তাই কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের সময়ে বারবার মুখ ফিরিয়ে নিলে তার ওপর কতটা নির্ভর করা যায়, তা ভেবে দেখা স্বাভাবিক। তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে পাশে থাকতে না পারাকে একা কারও চরিত্র বিচারের মাপকাঠি বানানো যাবে না।
আরও পড়ুন: সুখের দিনে যে আমল করলে বিপদের দিনে দোয়া কবুল হয়
উপকার মানুষের মর্যাদা বাড়াতে পারে, আবার খোঁটা দিলে সেই উপকারই কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম তাই দান ও উপকারের পর কাউকে অপমান বা কষ্ট দিতে নিষেধ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দানকে নষ্ট করো না।’ (সুরা বাকারা: ২৬৪)
কেউ যদি সাহায্য করার পর বারবার তা মনে করিয়ে দেয় কিংবা সেই কারণে অন্যকে হেয় করে, তার এই স্বভাব থেকে সতর্ক হওয়া দরকার। মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো যেমন মহৎ, তেমনি তার সম্মান অক্ষুণ্ন রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের ভালো থাকা দেখে নিজের মন খারাপ হওয়া আর তার নেয়ামত চলে যাক-এমনটা কামনা করা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয়টি হিংসার অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলাম নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি মানুষের প্রতি ঈর্ষা করে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন তার জন্য?’ (সুরা নিসা: ৫৪)
আরও পড়ুন: যাদের সঙ্গে ঈর্ষা করা জায়েজ
কেউ যদি অন্যের সাফল্য সহ্য করতে না পারে, তার অর্জনকে সবসময় ছোট করে দেখে কিংবা তার ভালো কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে সাময়িক মন খারাপ বা সুস্থ প্রতিযোগিতাকে হিংসা বলা ঠিক নয়। একজনের প্রকৃত মনোভাব বুঝতে তার ধারাবাহিক আচরণ দেখা জরুরি।
বিশ্বাসের জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো আমানত রক্ষা করা। কারও ব্যক্তিগত কথা তার অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে বলে দেওয়া সেই বিশ্বাসের পরিপন্থী।
হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, মজলিসের কথাবার্তাও আমানত। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৬৯)
তাই কেউ গোপন কথা রাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর তা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দিলে তার বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ব্যক্তিগত বিষয় কারও সঙ্গে ভাগ করার আগে সে কতটা আমানতদার, সেটিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
অন্যের উপকার স্বীকার করা সুন্দর চরিত্রের পরিচয়। এর বিপরীতে উপকার পাওয়ার পর তা অস্বীকার করা বা উপকারকারীর প্রতি অন্যায় আচরণ করা নিন্দনীয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)
যে ব্যক্তি বারবার অন্যের সহযোগিতা নেয়, কিন্তু প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সেই সহযোগিতার মূল্য অস্বীকার করে, তার এই প্রবণতা সম্পর্কের জন্য ভালো নয়। কৃতজ্ঞতা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়ায়, আর অকৃতজ্ঞতা দূরত্ব তৈরি করে।
আরও পড়ুন: কৃতজ্ঞ বান্দাদের জন্য আল্লাহর ঘোষণা
আপনার অনুপস্থিতিতে এমন কোনো দোষের কথা বলা, যা আপনি শুনলে অপছন্দ করবেন, সেটিই গিবত। সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, গিবত ইসলামে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করবে।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)
যে ব্যক্তি নিয়মিত অন্যের অনুপস্থিতিতে তাদের দোষ-ত্রুটি আলোচনা করে, তার কাছে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় বলার ক্ষেত্রেও সাবধান হওয়া ভালো। কারণ অন্যের সম্মান রক্ষা করার অভ্যাস বিশ্বস্ততারই অংশ।
সম্পর্ক একতরফা সুবিধা নেওয়ার নাম নয়। সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা থাকা প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩)
কেউ যদি সবসময় নিজের প্রয়োজন ও সুবিধাকে গুরুত্ব দেয়, অথচ অন্যের প্রয়োজনের সময় উদাসীন থাকে, তাহলে সম্পর্কটির ভারসাম্য নিয়ে ভাবা দরকার। তবে সামর্থ্য না থাকা বা কোনো বিশেষ সময়ে সহযোগিতা করতে না পারাকে স্বার্থপরতা বলা যাবে না। এখানে দেখতে হবে, নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কল্যাণের প্রতিও তার স্বাভাবিক আগ্রহ আছে কি না।
ইসলাম মানুষের চরিত্র বিচারে তাড়াহুড়ো করতে শেখায় না। একটি আচরণ বা একটি ভুল দিয়ে কাউকে চূড়ান্তভাবে বিচার করা ঠিক নয়। বরং তার দীর্ঘদিনের আচরণ, আমানতদারি, কৃতজ্ঞতা, বিপদের সময়ের ভূমিকা এবং অন্যের প্রতি ব্যবহার মিলিয়ে দেখাই বেশি যুক্তিসংগত।
অন্যকে বোঝার পাশাপাশি নিজের দিকেও তাকানো প্রয়োজন। আমরা যেমন বিশ্বস্ত ও ভালো মনের মানুষ চাই, নিজেদের মধ্যেও সেই গুণগুলো গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ২৬৪; সুরা নিসা: ৫৪; সুরা ইবরাহিম: ৭, সুরা হুজুরাত: ১২; সহিহ বুখারি: ১৩; সহিহ মুসলিম: ৪৫, ২৬৯৯; সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৬৯