ধর্ম ডেস্ক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষা। তবে জীবনে এমন মানুষও আসে, যারা আন্তরিকতার জন্য নয়, নিজের প্রয়োজনেই ভালো ব্যবহার করে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের আচরণও বদলে যায়। এমন কারও ব্যাপারে একজন মুমিনের অবস্থান কেমন হওয়া উচিত?
এ ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো- অকারণে সন্দেহ না করা, মানুষের আচরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের নীতি ঠিক রাখা।
কেউ আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেই তার পেছনে কোনো স্বার্থ আছে-এমন ধারণা করা ঠিক নয়। মানুষের অন্তরের খবর আল্লাহই জানেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।’ (সুরা হুজরাত: ১২)
তাই কারও আচরণে স্বার্থের আভাস পেলেও নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া তাকে স্বার্থপর বা প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
আরও পড়ুন: মুমিনের কথাবার্তা যেমন হবে
কেউ আপনার সঙ্গে নিজের প্রয়োজনে ভালো ব্যবহার করলেও আপনার আচরণ তার উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না। আপনি ভালো ব্যবহার করতে পারেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।’ (সহিহ বুখারি: ১; সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)
অন্যের নিয়ত আপনি জানেন না। নিজের নিয়ত ঠিক রাখার দায়িত্ব আপনার।
ভালো ব্যবহার করার অর্থ এই নয় যে, কেউ বারবার আপনার সরলতার সুযোগ নেবে আর আপনি একই ভুল করে যাবেন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘একজন মুমিন একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।’ (সহিহ বুখারি: ৬১৩৩)
কেউ প্রতারণা করলে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আগের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে একই ব্যক্তিকে বারবার একই সুযোগ দেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয় নয়।
কেউ আন্তরিক কি না, তা বোঝার জন্য তার দীর্ঘদিনের আচরণ দেখা দরকার। সে শুধু প্রয়োজনের সময় যোগাযোগ করে কি না, আপনার প্রয়োজনেও পাশে থাকে কি না, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কি না কিংবা আপনার দুর্বলতাকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করে কি না, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। (সহিহ বুখারি: ৩৩)
তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে মিষ্টি কথার পাশাপাশি মানুষের কাজকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: আড়ালে অন্যের ক্ষতি করা, ইসলাম কী বলে
সব স্বার্থই খারাপ নয়। ব্যবসায় লাভের উদ্দেশ্য থাকে, চাকরিতে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ হয়, মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যেও প্রয়োজন থাকে। এসব স্বাভাবিক।
অন্যায় শুরু হয় তখন, যখন নিজের সুবিধার জন্য কাউকে ধোঁকা দেওয়া, তার অধিকার নষ্ট করা বা তাকে অন্যায্যভাবে ব্যবহার করা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮) হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১)
তাই কারও কোনো স্বার্থ আছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই স্বার্থ পূরণ করতে সে ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করছে কি না।
কারও স্বার্থপরতা স্পষ্ট হয়ে গেলে তার সঙ্গে শত্রুতা করা জরুরি নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্কের সীমা ঠিক করা যায়।
ব্যক্তিগত তথ্য, অর্থনৈতিক বিষয় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতাও কমানো যায়।
এতে বিদ্বেষ থাকতে হবে এমন নয়। নিজের ক্ষতি থেকে সতর্ক থাকাই উদ্দেশ্য।
কেউ স্বার্থের জন্য আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে বলে তার উদ্দেশ্য নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে আপনিও খারাপ আচরণ করবেন-এমনটা ইসলামের শিক্ষা নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ভালো আর মন্দ সমান নয়। উৎকৃষ্ট দিয়ে মন্দকে দূর করুন।’ (সুরা ফুসসিলাত: ৩৪)
অন্যের অন্যায়ের জবাবে অন্যায় না করে নিজের শালীনতা ধরে রাখা যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে তার ওপর অন্ধ আস্থা রাখতে হবে।
মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা থাকলে তার আচরণে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। মুমিন মানুষের সহযোগিতা নেবে, মানুষের উপকার করবে, তবে চূড়ান্ত নির্ভরতা রাখবে আল্লাহর ওপর।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক: ৩)
তাই কেউ স্বার্থের কারণে আপনার কাছে এলে তার উদ্দেশ্য নিয়ে অস্থির না হয়ে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। স্বার্থপরতার জবাব স্বার্থপরতা দিয়ে নয়; সততা, বিচক্ষণতা ও সংযম দিয়ে।
এমএ
তথ্যসূত্র: সুরা হুজুরাত: ১২; সুরা বাকারা: ১৮৮; সুরা ফুসসিলাত: ৩৪; সুরা তালাক: ৩; সহিহ বুখারি: ১, ৩৩, ৬১৩৩; সহিহ মুসলিম: ১৯০৭, ১০১