ধর্ম ডেস্ক
৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
মানুষের আসল চরিত্র অনেক সময় প্রকাশ পায় তখনই, যখন যার সঙ্গে আচরণ করা হচ্ছে তিনি সামনে থাকেন না। সামনে ভালো ব্যবহার করা সহজ। সেই মানুষটির অনুপস্থিতিতেও তার সম্মান, অধিকার ও স্বার্থের প্রতি সৎ থাকা কঠিন।
হিংসা, স্বার্থ, প্রতিশোধ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে কেউ কেউ আড়ালে অন্যের ক্ষতি করে। অপবাদ ছড়ানো, গোপনে ষড়যন্ত্র করা, সম্পদ বা অধিকার নষ্ট করা কিংবা কাউকে বিপদে ফেলার চেষ্টা- এসব বড় অন্যায়।
ইসলাম মানুষের ক্ষতি করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। এমনকি অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত থাকাকে সদকার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেউ যদি সদকা করতে না পারে, তাহলে সে যেন অন্তত অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে। এটিও তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (সুনানে আবু দাউদ)
অন্যের ক্ষতি না করাও তাই একজন মুসলমানের জন্য নেক আমলের সুযোগ।
সামনে এক ধরনের আচরণ আর আড়ালে তার বিপরীত আচরণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। এমন দ্বিমুখী স্বভাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন তুমি ওই লোককে সব থেকে খারাপ পাবে, যে দু’মুখো। সে এদের সম্মুখে এক রূপ নিয়ে আসতো, আর ওদের সম্মুখে আসত অন্যরূপে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৫৮; সহিহ মুসলিম: ২৫২৬)
তবে কোনো একটি আচরণের কারণে কাউকে ‘মুনাফিক’ বলা ঠিক নয়।
আরও পড়ুন: অন্যের ভুল দেখলে মুমিন কী করবেন?
অন্যের ভালো থাকা, সাফল্য কিংবা সম্মান দেখে হিংসা থেকেই অনেক সময় ক্ষতি করার প্রবণতা তৈরি হয়। ইসলাম এই হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে বলেছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, ধোকাবাজি করো না, পরস্পর বিদ্বেষপোষণ করো না, একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশে অগোচরে শত্রুতা করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)
তাই অন্যের ভালো দেখে কষ্ট না পেয়ে নিজের অন্তরকে হিংসা থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করাই মুমিনের কর্তব্য।
কাউকে বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যে গোপনে পরিকল্পনা করাও ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘গোপন পরামর্শ হলো মুমিনদের দুঃখ দেয়ার জন্য শয়তান প্ররোচিত কাজ। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। ’ (সুরা মুজাদালা: ১০)
অবশ্য প্রয়োজনীয় বা কল্যাণকর বিষয়ে ব্যক্তিগত পরামর্শ নিন্দনীয় নয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতি করা যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)
এই নীতির আওতায় মানুষের শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি থেকে বিরত থাকা জরুরি। নিজের স্বার্থ, রাগ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও অন্যের অধিকার নষ্ট করা বৈধ নয়।
আরও পড়ুন: যে ৫ ক্ষেত্রে সত্য বলাও গুনাহের কারণ
কেউ হয়তো মনে করতে পারে, গোপনে করা অন্যায় প্রকাশ পাবে না। কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করার হিসাব আখেরাতে দিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.) ‘নিঃস্ব’ ব্যক্তির পরিচয় দিয়েছেন। সে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাতের নেকি নিয়ে আসবে। কিন্তু মানুষের ওপর জুলুম, অপমান, সম্পদ আত্মসাৎ কিংবা অন্যকোনো অন্যায়ের কারণে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)
তাই ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের হক আদায় করাও জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ।’ (সহিহ বুখারি: ১০)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ এবং যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে সে-ই প্রকৃত মুমিন।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৬২৭)
অর্থাৎ একজন মুমিনের কথা ও কাজে অন্যের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ থাকা উচিত নয়। তার কাছ থেকে মানুষের সম্মান, সম্পদ ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কারণ থাকবে না।
রাগ, হিংসা বা আবেগের বশে কারও ক্ষতি করে ফেললে তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। আল্লাহর কাছে তাওবার পাশাপাশি যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
কারও সম্পদ বা পাওনা নষ্ট করলে তা ফেরত দিতে হবে। অন্যায়ভাবে ক্ষতি করলে তা যথাসম্ভব সংশোধন করতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষমাও চাওয়া উচিত। মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে অনুতাপের সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিকার করাও জরুরি।
মোটকথা, মানুষের চোখ এড়িয়ে অন্যের ক্ষতি করা গেলেও আল্লাহর দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন করে, তা জানেন।’ (সুরা গাফির: ১৯)
তাই মানুষ সামনে থাকুক কিংবা না থাকুক, তার অধিকার ও সম্মানের প্রতি সৎ থাকা জরুরি। মানুষের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠাই একজন মুমিনের সুন্দর পরিচয়।
তথ্যসূত্র: কোরআন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে তিরমিজি ও সুনানে আবু দাউদ