ধর্ম ডেস্ক
৩১ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
একটি শিশু যখন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তার শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি গভীর মানসিক আঘাতও তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে নিরাপদ রাখা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা পরিবারের দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবার লোকলজ্জা, সামাজিক মর্যাদা, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা ‘মানুষ কী বলবে’- এই চিন্তায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, যা শিশুর ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নির্যাতনের শিকার শিশুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সহানুভূতিশীল আচরণ, গোপনীয়তা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ইসলামও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে। যদিও তা তোমাদের নিজদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)
শিশু ধর্ষণের ঘটনায় পরিবারের যে ভুলগুলো কোনোভাবেই করা উচিত নয়, সেগুলো হলো-
‘মানুষ কী বলবে’, ‘পরিবারের সম্মান থাকবে তো?’ কিংবা ‘ভবিষ্যতে বিয়ে হবে কীভাবে?’- এমন চিন্তা থেকে অনেক পরিবার ঘটনা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এতে শিশুর নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও বিচার না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি জবাবদিহির বাইরে থেকে যেতে পারেন এবং এতে অন্যদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: অনলাইনে যৌনফাঁদ, লেনদেনে প্রতারণা, লোকলজ্জার ভয়ে আড়ালে বহু ঘটনা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়েদা: ২)
তাই সামাজিক সম্মানের অজুহাতে গুরুতর অপরাধ আড়াল করা ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
‘তুমি সেখানে গেলে কেন?’, ‘আগে বলোনি কেন?’, ‘তার সঙ্গে একা ছিলে কেন?’- এমন প্রশ্ন শিশুর মনে ভয় ও অপরাধবোধ তৈরি করতে পারে।
নির্যাতনের শিকার শিশুকে প্রথমেই বোঝানো প্রয়োজন- যা ঘটেছে, তার জন্য তুমি দায়ী নও।
শিশুর সঙ্গে সহানুভূতিশীল ও বিচারহীন আচরণ করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে তার মানসিক চাপ বাড়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি সবসময় অপরিচিত কেউ হবেন-এমন ধারণা বিপজ্জনক। আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের পরিচিত ব্যক্তিও অভিযুক্ত হতে পারেন।
তাই ‘সে আমাদের আত্মীয়’, ‘ওকে তো ছোটবেলা থেকে চিনি’ কিংবা ‘সে এমন কাজ করতে পারে না’- এসব ধারণার কারণে শিশুর বক্তব্য উপেক্ষা করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনানে তিরমিজি)
আরও পড়ুন: ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণে কি ৪ সাক্ষী লাগে?
শিশুর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আত্মীয়তার সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া ঠিক নয়।
অনেকে মনে করেন, চিকিৎসা করানো বা কিছুদিন সময় পার হলেই শিশু আগের মতো হয়ে যাবে। বাস্তবে যৌন নির্যাতনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ভয়, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা কিংবা আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তাই শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে ‘নাটক’ বা ‘বাড়াবাড়ি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত অনেকেই কৌতূহল থেকে শিশুর কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান। এতে একই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বারবার মনে করে শিশুর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজনীয় তথ্য চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কৌতূহলী মানুষের কাছে শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত নয়।
‘মীমাংসা’ করে দেওয়ার নামে গুরুতর যৌন অপরাধকে স্থানীয়ভাবে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় অনেক সময়। এতে শিশুর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দুটিই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সামাজিক চাপ, অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা না করে পরিবারকে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার সহায়তা নিতে হবে।
আরও পড়ুন: ধর্ষণের শিকার নারীর সন্তান নষ্ট করা কি জায়েজ?
অনেক পরিবার না বুঝে ঘটনার পরপরই শিশুকে গোসল করিয়ে দেয়, কাপড় ধুয়ে ফেলে কিংবা অন্যান্য সম্ভাব্য আলামত নষ্ট করে ফেলে।
এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে আলামত সংরক্ষণ করতে হবে, সে বিষয়ে অনুমান না করে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
‘আর এমন হবে না’- এমন আশ্বাসে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর আবার দেখা করা বা একা থাকার সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ সময় পরিবারের প্রথম দায়িত্ব হলো শিশুকে নিরাপদ রাখা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধিনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)
সন্তান বাবা-মায়ের কাছে আল্লাহর দেওয়া আমানত। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সেই আমানতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিশু এমন পরিস্থিতির শিকার হলে পরিবারের আচরণ হওয়া উচিত শান্ত, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল। তাই-
একটি শিশুর জীবনে এমন ঘটনা ঘটলে তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও পরিবারের পাশে থাকা। লোকলজ্জা বা সামাজিক চাপের কারণে তাকে একা করে দেওয়া উচিত নয়।
ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষার নীতিমালা একই কথা বলে- অন্যায় আড়াল নয়, নির্যাতিত শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিপদের সময়ে শিশুর পাশে দাঁড়ানো ও তাকে নিরাপদ রাখা পরিবারের দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: সুরা নিসা: ১৩৫; সুরা মায়েদা: ২; সহিহ বুখারি: ৮৯৩; সুনানে তিরমিজি; WHO-এর শিশু যৌন নির্যাতনবিষয়ক নির্দেশনা