Dhaka Mail Logo

ইসলাম

অন্যের ভুল দেখলে মুমিন কী করবেন?

ধর্ম ডেস্ক

০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

মানুষ মাত্রই ভুল করে। তবে কারও ভুল চোখে পড়লে তাকে সবার সামনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা তার দুর্বলতা ছড়িয়ে দেওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। ইসলাম মানুষের ভুল সংশোধনের পাশাপাশি তার সম্মান রক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যের ভুল বা ত্রুটি দেখলে একজন মুমিনের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে ইসলামে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।

১. প্রথমেই সত্যতা যাচাই করা

কারও ব্যাপারে কোনো নেতিবাচক কথা শুনলে বা কোনো ভুলের কথা জানতে পারলে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিষয়টি আগে যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে। অনেক সময় আংশিক তথ্য, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে নির্দোষ মানুষও সমালোচনার শিকার হন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। পাছে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও।’ (সুরা হুজরাত: ৬)

তাই কারও ভুল নিয়ে কথা বলার আগে সত্যতা নিশ্চিত করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

২. জনসমক্ষে অপমান না করা

ভুল দেখলেই কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা, গালিগালাজ করা কিংবা সবার সামনে অপমান করা ইসলামের আদর্শ নয়। রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন: মানুষকে অপমান নয়, সম্মান দিন: ইসলামের বার্তা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুমিন তিরস্কারকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী ও কদর্যভাষী হয় না।’ (জামে তিরমিজি: ১৯৭৭)

তাই কারও ভুল চোখে পড়লেও সংযত থেকে মার্জিত ভাষায় কথা বলা এবং তার সম্মান রক্ষা করা একজন মুমিনের পরিচয়।

৩. গোপনে ও নরম ভাষায় সংশোধন করা

কারও ভুল সংশোধনের উত্তম পদ্ধতি হলো তাকে সবার সামনে বিব্রত না করে একান্তে বুঝিয়ে বলা। এতে তার আত্মসম্মান বজায় থাকে এবং উপদেশ গ্রহণের সম্ভাবনাও বাড়ে।

এমনকি ফেরাউনের মতো জালিমের কাছেও দাওয়াত দেওয়ার সময় আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে নরম ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নরম কথা বলো। হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা ত্বহা: ৪৪)

এ থেকে বোঝা যায়, সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, তাকে হেয় করা নয়।

৪. দোষ গোপন রাখা ও প্রচার না করা

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ভুল, ব্যক্তিগত দুর্বলতা কিংবা কোনো বিব্রতকর ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। একজন মুমিনের জন্য এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকা জরুরি।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)

আরও পড়ুন: অন্যের দোষ গোপন রাখার ৬ ফজিলত

তবে দোষ গোপন রাখার অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। কারও ভুল সংশোধনের প্রয়োজন হলে যথাযথ ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং ক্ষতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া আলাদা বিষয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সংশোধন ও কল্যাণ, অপমান বা প্রচার নয়।

৫. নিজের ভুল স্মরণ করা ও ক্ষমা করা

অন্যের ভুল বিচার করার আগে নিজের দুর্বলতার কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনোভাবে ভুল করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সব আদমসন্তানই ভুলকারী। আর সর্বোত্তম ভুলকারী হলো তারা, যারা তওবা করে।’ (জামে তিরমিজি: ২৪৯৯)

এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং অন্যের প্রতি সহনশীল হতে শেখায়। পাশাপাশি কারও ভুল ক্ষমা করে দেওয়াও মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ (এমন) সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)

অতএব, অন্যের ভুল দেখা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের কোনো মাধ্যম নয়। এটি নিজের ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক উদারতারও একটি পরীক্ষা। ইসলাম মানুষকে হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে সংশোধনের পথ দেখাতে শেখায়, অপমান ও হেয় করতে নয়। তাই অন্যের ভুলের ক্ষেত্রে কঠোরতা, বিদ্রূপ ও প্রচারের পরিবর্তে সত্যতা যাচাই, মমতা, গোপনীয়তা এবং সুন্দরভাবে সংশোধনের পথ বেছে নেওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।