Dhaka Mail Logo

ইসলাম

পিরিয়ড অবস্থায় মোবাইলে কোরআন পড়া যাবে?

ধর্ম ডেস্ক

২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

পিরিয়ড বা হায়েজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা। এ সময় নামাজ ও রোজার মতো কিছু ইবাদত থেকে সাময়িক বিরতি দিয়েছে ইসলাম, তবে আল্লাহর জিকির, দোয়া, ইস্তেগফার ও নেক আমলের পথ সবসময় উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। অনেক নারী জানতে চান, পিরিয়ড অবস্থায় মোবাইল অ্যাপে কোরআন তেলাওয়াত করা যাবে কি না। আবার অনেকে জানতে চান, এ সময় কোরআন তেলাওয়াত শোনা বা কোরআনের অর্থ অধ্যয়ন করার বিধান কী।
হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ও সমসাময়িক ফকিহদের মতামতের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

কোরআন তেলাওয়াতের বিধান

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় এবং যাদের ওপর গোসল ফরজ, তাদের জন্য মুখ ফুটে কোরআন তেলাওয়াত করা জায়েজ নেই। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘হায়েজ অবস্থায় থাকা নারী এবং জুনুব ব্যক্তি (যার ওপর গোসল ফরজ) কোরআন থেকে কিছুই তেলাওয়াত করবে না।’ (সুনান তিরমিজি: ১৩১)
এই নিষেধাজ্ঞাটি মূলত ‘তেলাওয়াত’ বা মুখে উচ্চারণ করে পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মুসহাফ (কোরআনের পাণ্ডুলিপি) দেখে হোক কিংবা মোবাইলের স্ক্রিন দেখে- মুখ ফুটে বা ফিসফিস করে তেলাওয়াত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

চোখ দিয়ে দেখা ও মনে মনে স্মরণ করা

হানাফি ফিকহে তেলাওয়াতের সংজ্ঞায় ‘জিহ্বা বা ঠোঁট নাড়িয়ে উচ্চারণ করা’ শর্ত। সুতরাং, মুখে উচ্চারণ না করে কেবল চোখ দিয়ে কোরআনের আয়াত দেখা, অর্থ নিয়ে চিন্তা করা বা মনে মনে আয়াতগুলো স্মরণ করা জায়েজ। কারণ এটি তেলাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং চিন্তা ও স্মরণের অন্তর্ভুক্ত। যারা হিফজ করছেন বা নিয়মিত কোরআন চর্চা করেন, তারা এ পদ্ধতিতে চর্চা অব্যাহত রাখতে পারেন।

আরও পড়ুন: পিরিয়ড অবস্থায় ইস্তেগফার ও দুরুদ পড়া যাবে?

মোবাইল স্পর্শ করার বিধান

হানাফি মাজহাবের সমসাময়িক অনেক আলেমের মতে, মোবাইল ফোন সরাসরি ‘মুসহাফ’ বা কোরআনের পাণ্ডুলিপির অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ মোবাইলের স্ক্রিনে কোরআনের আয়াত স্থায়ীভাবে মুদ্রিত থাকে না। তাই অজুহীন বা অপবিত্র অবস্থায় মোবাইল ধরা বা পকেটে রাখা জায়েজ।
তবে, আদবের খাতিরে তারা পরামর্শ দেন যে, স্ক্রিনে যখন কোরআনের আয়াত দৃশ্যমান থাকে, তখন সরাসরি আয়াতের ওপর আঙুল না রেখে মোবাইলের বডি বা স্ক্রিনের খালি জায়গায় স্পর্শ করা উত্তম। এটি একটি ঐচ্ছিক আদব, কোনো কঠোর শরয়ি বাধ্যবাকত নয়।

শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড়

কোরআন শিক্ষার প্রয়োজনে হানাফি ফকিহগণ একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুমোদন করেছেন। যদি কোনো নারী শিক্ষক বা শিক্ষার্থী হন, তবে তিনি পূর্ণ আয়াত এক নিঃশ্বাসে না পড়ে শব্দে শব্দে (কালিমা কালিমা) বা অংশ অংশ করে ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করতে পারবেন। (যেমন ‘আলহামদু’ বলে থামা, তারপর ‘লিল্লাহি’ বলা)। তবে মনে রাখতে হবে, এটি সাধারণ তেলাওয়াতের অনুমতি নয়, কেবল শিক্ষাদানের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। (তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, আল-বাহরুর রায়েক)

আরও পড়ুন: নফল পড়া অবস্থায় পিরিয়ড হলে ওই নামাজ কাজা করতে হবে কি?

দোয়া ও জিকিরের নিয়তে কোরআনের আয়াত পড়া

কোরআনের যেসব আয়াত মূলত দোয়া বা জিকির হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো তেলাওয়াতের নিয়তে না পড়ে যদি ‘দোয়া’ বা ‘জিকিরে’র নিয়তে পড়া হয়, তাহলে হানাফি মাজহাবে জায়েজ।
যেমন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনিয়া হাসানাহ...’ (সুরা বাকারা: ২০১) এবং কোরআনে বর্ণিত অন্যান্য দোয়াসংবলিত আয়াতগুলো দোয়া বা জিকিরের নিয়তে পড়া যাবে। (তথ্যসূত্র: আহসানুল ফতোয়া: ২/৬৮)

এ অবস্থায় যেসব আমল করা যাবে

পিরিয়ড চলাকালীন নারীরা ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন না থেকে নিচের আমলগুলো করতে পারেন-

  • তেলাওয়াত শোনা: অডিও বা ভিডিওতে কোরআন তেলাওয়াত শোনা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ
  • তাফসির ও অর্থ অধ্যয়ন: কোরআনের অনুবাদ, তাফসির, হাদিস এবং ইসলামি বই-পুস্তক পড়া যাবে
  • জিকির ও তাসবিহ: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, দরুদ শরিফ এবং ইস্তেগফার বেশি বেশি পাঠ করা
  • মাসনুন দোয়া: সকাল-সন্ধ্যার দোয়া ও জিকিরগুলো পাঠ করা

আরও পড়ুন: নামাজের মধ্যে পিরিয়ড শুরু হলে করণীয়

যেসব ইবাদত থেকে বিরত থাকতে হবে

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এ অবস্থায়-

  • নামাজ আদায় করা যাবে না (এর কাজা নেই)
  • রোজা রাখা যাবে না (পরবর্তীতে ফরজ রোজার কাজা করতে হবে)
  • কোরআন তেলাওয়াত করা যাবে না, তা মুসহাফ দেখে হোক বা মোবাইলের স্ক্রিন দেখে
  • পবিত্রতা ছাড়া সরাসরি কোরআনের পাণ্ডুলিপি (মুসহাফ) স্পর্শ করা যাবে না
  • কাবা শরিফ তাওয়াফ করা যাবে না

অতএব, হানাফি মাজহাব অনুসরণকারী নারীদের জন্য পিরিয়ড অবস্থায় মোবাইল থেকেও মুখে উচ্চারণ করে কোরআন তেলাওয়াত থেকে বিরত থাকাই শরয়ি বিধান। তবে এ সময় কোরআনের অর্থ অধ্যয়ন, তাফসির পড়া, তেলাওয়াত শোনা, জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফারে ব্যস্ত থেকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়।

তবে যেহেতু এ বিষয়ে কিছু সমসাময়িক আলেমের ভিন্ন মত রয়েছে, তাই কেউ যদি অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য ফিকহি মত অনুসরণ করেন, তাহলে এ নিয়ে পারস্পরিক বিরোধ বা বিতর্কে জড়ানো উচিত নয়। প্রত্যেকের উচিত নিজের অনুসৃত নির্ভরযোগ্য আলেম বা দারুল ইফতার ফতোয়া অনুযায়ী আমল করা।

তথ্যসূত্র: আল-মাবসুত; আল বাহরুর রায়েক; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৩৮; রদ্দুল মুহতার: ১/২৯৩; আহসানুল ফতোয়া: ২/৬৮; সুনান তিরমিজি: ১৩১; সহিহ বুখারি ও মুসলিম (কিতাবুল হায়েজ)