ধর্ম ডেস্ক
২৭ জুলাই ২০২৬, ০২:৩১ পিএম
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক যুবকের সঙ্গে তিন সহোদরা বোনের বিয়ের দাবি করে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি ঘিরে নানা আলোচনা তৈরি হওয়ার পর অনেকের মনে প্রশ্ন এসেছে, ইসলামের দৃষ্টিতে একই সময়ে দুই বা ততোধিক সহোদরা বোনকে বিয়ে করার বিধান কী?
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধন, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং সামাজিক ভারসাম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই পবিত্র শরিয়তে কিছু নারীকে একই সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা যেসব নারীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছেন, তাদের তালিকায় দুই বোনকে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর দুই বোনকে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করা (তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ)...।’ (সুরা নিসা: ২৩)
এই আয়াতের ভিত্তিতে ইসলামি শরিয়তের বিধান হলো, কোনো পুরুষ একই সময়ে দুই সহোদরা বোনকে স্ত্রী হিসেবে রাখতে পারবেন না।
আরও পড়ুন: একাধিক বিয়ে: ইসলাম কী বলেছে, আমরা কী করছি?
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কোরআনে তো দুই বোনের কথা বলা হয়েছে, তাহলে তিন বা তার বেশি বোনের ক্ষেত্রে বিধান কী?
ইসলামি ফিকহের মূলনীতির আলোকে, যেখানে দুই সহোদরা বোনকে একই সময়ে বিবাহবন্ধনে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে তিন বা তার বেশি সহোদরা বোনকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে রাখাও বৈধ নয়। হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি সব মাজহাবের ফকিহরা এ বিষয়ে একমত। ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে এই বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামের বিধানগুলো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও সমাজে শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত হয়েছে। দুই সহোদরা বোনকে একই সময়ে এক ব্যক্তির বিবাহবন্ধনে না রাখার নির্দেশও পারিবারিক সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্বকে তুলে ধরে।
শরিয়তবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দুই বোন একই ব্যক্তির স্ত্রী হলে তাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক দাম্পত্য জীবনের প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ বা পারিবারিক জটিলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এ কারণে ইসলাম আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ৩ শর্তে একাধিক স্ত্রী নিয়ে ঘুমানো জায়েজ
স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় তার বোনকে বিয়ে করা বৈধ নয়।
তবে কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর মৃত্যু হলে অথবা তালাকের পর স্ত্রীর ইদ্দত (নির্দিষ্ট সময়কাল) শেষ হলে, শরিয়তের অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তিনি ওই স্ত্রীর বোনকে বিয়ে করতে পারেন।
সহোদরা বোন ছাড়াও নিকটাত্মীয় নারীদের একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে রাখার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশনা দিয়েছেন।
হাদিসে এসেছে, ‘কোনো নারী ও তার ফুফুকে এবং কোনো নারী ও তার খালাকে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে রাখা যাবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫১০৯)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম নিকটাত্মীয় নারীদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পারিবারিক ভারসাম্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
কারও অজ্ঞতা বা ভুলের কারণে যদি একই সময়ে দুই বা ততোধিক সহোদরা বোনের সঙ্গে বিবাহের ঘটনা ঘটে, তাহলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সেই অবস্থা সংশোধন করতে হয়। কারণ, ইসলাম একই সময়ে সহোদরা বোনদের এক ব্যক্তির বিবাহবন্ধনে রাখার অনুমতি দেয় না।
ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে বৈবাহিক সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং মোহর, ইদ্দত ও সন্তান-সন্ততির বিষয়গুলো কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা ঘটনার বিস্তারিত অবস্থা ও বিবাহের ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করে।
এ কারণে এমন বিষয়ে সাধারণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে শরিয়তসম্মত সমাধান গ্রহণ করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ঘটনাটি ইসলামে বিয়ের বিধান নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ইসলামি শরিয়তের বিধানগুলো মানুষের কল্যাণ, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত। তাই বিয়ে ও পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা এবং প্রয়োজন হলে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: সুরা নিসা, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থ