ধর্ম ডেস্ক
২৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
‘ইনকিলাব’ শব্দটি বর্তমানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় আলোচনায় বেশ পরিচিত। অনেকের কাছে শব্দটি বিপ্লব, আন্দোলন কিংবা কোনো ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। তবে আরবি ভাষায় এর অর্থ আরও বিস্তৃত। ইসলামের দৃষ্টিতে ইনকিলাব বলতে মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা, চরিত্র ও জীবনধারার পরিবর্তনকেও বোঝায়।
‘ইনকিলাব’ (انقلاب) আরবি শব্দ। এর মূল ধাতু হলো ق ل ب। আরবি ভাষায় এই ধাতুর অর্থ ঘুরে যাওয়া, পরিবর্তিত হওয়া কিংবা এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়া।
এই একই আরবি ধাতু থেকে ‘ক্বলব’ (قَلْب) শব্দ এসেছে, যার অর্থ হৃদয় বা অন্তর। মানুষের অন্তরকে ‘ক্বলব’ বলা হয়, কারণ মানুষের মন ও প্রবণতায় দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (স.) দোয়া করতেন- ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কলবি আলা দ্বীনিক।’ অর্থ: ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।’ (জামে তিরমিজি: ৩৫২২)
এই দোয়া থেকে বোঝা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের পরিবর্তনের শুরু হয় তার অন্তর থেকে। বিশ্বাস ও চিন্তার পরিবর্তন মানুষের কাজ ও আচরণেও প্রভাব ফেলে।
পবিত্র কোরআনে ‘ইনকিলাব’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি। তবে একই ধাতু থেকে গঠিত বিভিন্ন শব্দ কোরআনে এসেছে, যেখানে ফিরে যাওয়া, পরিণতি ও অবস্থার পরিবর্তনের অর্থ প্রকাশ পেয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর যারা জুলুম করেছে, তারা শিগগিরই জানতে পারবে কোন প্রত্যাবর্তনস্থলে তারা ফিরে যাচ্ছে।’ (সুরা আশ-শুআরা: ২২৭)
এখানে ‘মুনকালাব’ শব্দটি ফিরে যাওয়ার স্থান ও চূড়ান্ত পরিণতির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
আরও পড়ুন: জুলাই বিপ্লব ছিল ইসলামী বিপ্লবের পূর্বাভাস: মামুনুল হক
রাসুলুল্লাহ (স.) যখন মক্কায় ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন, তখন আরব সমাজের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও সামাজিক জীবনে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়। এই পরিবর্তন ছিল মানুষের চিন্তা ও জীবনধারার পরিবর্তন। শিরক থেকে তাওহিদের দিকে, অন্যায় থেকে ন্যায়ের দিকে এবং অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
ইসলামে পরিবর্তনের বিষয়টি ব্যক্তি সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ: ১১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সমাজে স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য মানুষের নিজের ভেতরের পরিবর্তন জরুরি।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাওবা ও আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। পাপ থেকে ফিরে আসা, নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে জীবন গড়ে তোলাই একজন মুমিনের বড় পরিবর্তনের অংশ।
ইসলামে পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো অন্যায়, অবিচার ও অশান্তি দূর করে সংশোধন ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। আরবি ভাষায় একে ‘ইসলাহ’ বলা হয়।
যে পরিবর্তন মানুষের মধ্যে ন্যায়, শান্তি, তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র তৈরি করে, তা প্রশংসনীয়। অন্যদিকে যে পরিবর্তন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়, ইসলাম তা সমর্থন করে না।
ইসলামি দৃষ্টিতে প্রকৃত ইনকিলাব হলো অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসা।
আরও পড়ুন: ইসলামি শরিয়তে আন্দোলনের পথনির্দেশনা
‘ইনকিলাব’ শব্দটি ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। আরবি ভাষা থেকে আসা এই শব্দটি সময়ের ব্যবধানে উর্দু, ফারসি ও উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ অর্থ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। ইতিহাসবিদদের মতে, এই স্লোগানটি প্রথম ব্যবহার করেন বিশিষ্ট মুসলিম চিন্তাবিদ, উর্দু কবি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মাওলানা হাসরাত মোহানি (১৮৭৫–১৯৫১)। ১৯২১ সালে তিনি এই স্লোগান ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যায় ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেন।
পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি ব্যবহৃত হয়। তবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ব্যবহারে এর ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কারও কাছে এটি ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান, আবার কারও কাছে ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সামাজিক রূপান্তরের প্রতীক।
ইসলামি দৃষ্টিতে ‘ইনকিলাব’ শব্দের তাৎপর্য শুধু বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও চরিত্রের পরিবর্তনও এর গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ কারণে মুসলিম চিন্তাবিদদের আলোচনায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি অনেক সময় আত্মশুদ্ধি, সমাজ সংস্কার ও কল্যাণমূলক পরিবর্তনের অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো মানুষের নিজের ভেতরের পরিবর্তন। পাপ থেকে তওবার পথে ফিরে আসা, অন্যায় থেকে ন্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া, অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে যাওয়া এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত পরিবর্তন।
প্রকৃত ইনকিলাব শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে। যে পরিবর্তন একজন মানুষকে আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ণ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী করে তোলে, ইসলামের দৃষ্টিতে সেটিই সবচেয়ে মূল্যবান পরিবর্তন।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন, জামে তিরমিজি, আরবি ভাষার অভিধান ও ঐতিহাসিক সূত্র