ধর্ম ডেস্ক
১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
আমাদের সমাজে রিজিক বলতে অনেকেই কেবল টাকা-পয়সা বা ধন-সম্পদকে বুঝি। কিন্তু ইসলামের ব্যাপক সংজ্ঞায় রিজিক কেবল অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। সুস্বাস্থ্য, নেক সন্তান, মানসিক প্রশান্তি, অর্জিত জ্ঞান, নিরাপত্তা এবং সময়ের সদ্ব্যবহার- এসবই আল্লাহর দেওয়া রিজিকের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাস্তব জীবনে দেখা যায়, অল্প আয়েও কেউ পরম তৃপ্তিতে জীবন কাটাচ্ছেন, আবার অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও কেউ দুশ্চিন্তা বা পারিবারিক অশান্তিতে ভুগছেন। এখানেই আসে বরকত বা কল্যাণের ধারণা। পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা উল্লেখ রয়েছে, যা আল্লাহর ইচ্ছায় বান্দার রিজিকে বরকত ও কল্যাণের কারণ হতে পারে।
তাকওয়া বা আল্লাহভীতি হলো আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক: ২-৩)। ব্যবসা বা চাকরিতে অসততা ও হারাম পথ পরিহার করাই হলো বাস্তব জীবনে তাকওয়ার প্রতিফলন।
তাওয়াক্কুল মানে অলস হয়ে বসে থাকা নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করা। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা- ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক: ৩)
আরও পড়ুন: আল্লাহর ওপর যারা তাওয়াক্কুল করে তাদের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর
গুনাহ মানুষের রিজিক ও বরকত কমিয়ে দিতে পারে। নবী নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ইস্তেগফার করলে আল্লাহ তাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন। (সুরা নূহ: ১০-১২)। নিয়মিত ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমতের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ।
মানবিক দৃষ্টিতে দান করলে সম্পদ কমে মনে হলেও, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে তা সম্পদকে পরিশুদ্ধ ও বরকতময় করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)। নিয়মিত দান করার অভ্যাস অভাব দূর করতে এবং মনে প্রশান্তি আনতে সহায়তা করে।
যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’
এটি কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং রিজিকে বরকত লাভের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)। এখানে ‘আয়ু বৃদ্ধি’ বলতে জীবনে কাজ ও ইবাদতের বরকতকেও বোঝানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: আত্মীয় স্বজনের দুঃসময়ে মুমিনের করণীয়
দারিদ্র্যের ভয়ে বিয়ে বিলম্বিত করার প্রবণতাকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা অভাবী কিন্তু সৎচরিত্রের মানুষদের বিয়ের মাধ্যমে অভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (সুরা নূর: ৩২) এটি মূলত সামাজিক পবিত্রতা ও রিজিকে বরকতের একটি বিশেষ মাধ্যম।
হাদিসে হজ ও ওমরাকে আল্লাহর ইচ্ছায় দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা ধারাবাহিকভাবে হজ ও ওমরা আদায় করো। কেননা এ দুটি (ইবাদত) দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে, যেমন হাপর (কামারের আগুনে ব্যবহৃত বায়ুপ্রবাহের যন্ত্র) লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে।’ (তিরমিজি: ৮১০)
দিনের শুরুতে জীবিকার কাজে মনোযোগ দেওয়া ইসলামে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে (সকালের সময়ে) বরকত দান করুন।’ (আবু দাউদ: ২৬০৬) সকালে দ্রুত কাজ শুরু করা সময়ের সদ্ব্যবহার ও বরকতের একটি বড় মাধ্যম।
প্রচলিত একটি ধারণা হলো, নিয়মিত সুরা ওয়াকেয়া পাঠ করলে দারিদ্র্য দূর হয়। এ বিষয়ে একটি হাদিস বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হলেও এর সনদকে অনেক মুহাদ্দিস দুর্বল (জয়িফ) হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। আবার কিছু আলেম ফাজায়েলে আমলের ক্ষেত্রে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করে থাকেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো আমলের বিশেষ ফজিলত নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সহিহ ও শক্তিশালী দলিলের ওপর নির্ভর করাই অধিক নিরাপদ ও উত্তম। অবশ্য পবিত্র কোরআনের প্রতিটি সুরাই হেদায়াত, রহমত ও বরকতের উৎস।
পরিশেষে বলা যায়, রিজিকে বরকত লাভের এসব আমল কোনো যান্ত্রিক সূত্র নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ইবাদত। ফলাফল সম্পূর্ণই তাঁর ইচ্ছা ও হেকমতের ওপর নির্ভরশীল। একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত হালাল পথে উপার্জন করা এবং সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল, পবিত্র ও বরকতময় রিজিক দান করুন। আমিন।