Dhaka Mail Logo

ইসলাম

মরক্কোর মুসলিমরা কোন মাজহাব অনুসরণ করেন?

ধর্ম ডেস্ক

০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কো দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের জ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাস, ফিকহ, আকিদা ও আধ্যাত্মিক চর্চায় দেশটির রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে- মরক্কোর মুসলিমরা কোন মাজহাব অনুসরণ করেন?

এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, মরক্কোর অধিকাংশ মুসলিম সুন্নি মালিকি মাজহাব অনুসরণ করেন। পাশাপাশি আকিদার ক্ষেত্রে দেশটিতে প্রধানত আশআরি মতবাদ এবং আধ্যাত্মিক চর্চায় সুন্নি তাসাউফের জুনায়েদি ধারা অনুসৃত হয়ে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই তিনটি ধারার সমন্বয়ই মরক্কোর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

মরক্কোতে ইসলামের আগমন

মরক্কোতে ইসলামের আগমন সপ্তম শতাব্দীতে। বিশিষ্ট মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবনে নাফে (রহ.)-এর নেতৃত্বে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের প্রসার শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বার্বার জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ইসলামের ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি সভ্যতার দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে এবং মরক্কো ধীরে ধীরে ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।

মরক্কোর ধর্মীয় পরিচয়ের তিনটি প্রধান স্তম্ভ

মরক্কোর ধর্মীয় জীবনের ভিত্তি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যাকে সে দেশে 'আস-সাওয়াবিত আদ-দীনিয়্যাহ' (الثوابت الدينية) বা 'ধর্মীয় ধ্রুবক' বলা হয়। এগুলো হলো-

  • আকিদায়: আশআরি মতবাদ
  • ফিকহে: মালিকি মাজহাব
  • তাসাউফে: জুনায়েদি ধারা (ইমাম জুনায়েদ বাগদাদী (রহ.)-এর অনুসৃত সুন্নাহভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা)

মরক্কোর সরকারি ধর্মীয় নীতিতে এই তিনটি ধারাকে দেশের ধর্মীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং রাষ্ট্র এগুলোর সংরক্ষণ ও প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

আরও পড়ুন: মরক্কোর ১২টি ইসলামি ঐতিহ্য, যা জানলে আপনিও মুগ্ধ হবেন

মালিকি মাজহাব ও ‘আমালু আহলিল মাদিনা’

মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)। তিনি মদিনায় বসবাস করতেন এবং তাঁর বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ 'আল-মুওয়াত্তা' ইসলামের অন্যতম প্রাচীন হাদিস ও ফিকহসংক্রান্ত সংকলন।

মালিকি ফিকহের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘আমালু আহলিল মাদিনা’ (মদিনাবাসীর ধারাবাহিক আমল)। ইমাম মালিক (রহ.) মনে করতেন, সাহাবিদের যুগ থেকে মদিনায় ধারাবাহিকভাবে প্রচলিত আমল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাই মালিকি ফিকহে এটি শরয়ি দলিলগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত।

উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে মরক্কোতে মালিকি মাজহাবের বিস্তারে ইমাম সাহনুন (রহ.) সংকলিত 'আল-মুদাওয়ানাহ আল-কুবরা' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তী সময়ে আন্দালুস থেকে আগত বহু আলেম ও মুসলিম পরিবারও মরক্কোতে মালিকি ফিকহ, ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

মালিকি মাজহাবের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য

মালিকি মাজহাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, কোরআন, সুন্নাহ ও ইজমার পাশাপাশি ‘আমালু আহলিল মাদিনা’ (মদিনাবাসীর ধারাবাহিক আমল)কে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গ্রহণ করা। জনকল্যাণ (মাসলাহা), প্রয়োজনীয়তা এবং শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) বিবেচনায় রেখেও এ মাজহাবে বহু মাসআলার সমাধান দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার বহু অঞ্চলে মালিকি ফিকহ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে।

আরও পড়ুন: ফ্রান্সের প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ: মুসলিম সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্মারক

আমিরুল মুমিনিন ও আলাউয়ি রাজবংশ

মরক্কোর ইসলামি পরিচয়ের একটি বিশেষ দিক হলো দেশটির বাদশাহর ‘আমিরুল মুমিনিন’ (মুমিনদের নেতা) উপাধি। মরক্কোর ২০১১ সালের সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে বাদশাহকে ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষ সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতৃত্ব হিসেবে তিনি দেশটির ধর্মীয় ঐক্য এবং সুন্নি ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ধারার সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করেন।

বর্তমান আলাউয়ি রাজবংশ সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মরক্কো শাসন করছে। তারা নিজেদের বংশধারাকে মহানবী (স.)-এর দৌহিত্র হাসান ইবনে আলী (রা.)-এর মাধ্যমে আহলে বাইতের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা দেশটিতে মালিকি মাজহাব ও সুন্নি তাসাউফের ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রখ্যাত আলেম ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র

মরক্কোর কথা বললে প্রখ্যাত মালিকি আলেম আল-কাদি ইয়াদ (রহ.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ-শিফা’ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর মর্যাদা, অধিকার ও ভালোবাসা বিষয়ে রচিত ইসলামের অন্যতম প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। মরক্কোসহ মুসলিম বিশ্বের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদে এটি গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করা হয়।

এ ছাড়া ফেজ শহরে অবস্থিত আল-কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম নারী ফাতিমা আল-ফিহরি (রহ.) এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ইউনেস্কো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যানুযায়ী, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মালিকি ফিকহ, কোরআন, হাদিস, আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

মরক্কোর আরেক গর্ব বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ও পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি নিজেও মালিকি ফিকহে শিক্ষিত ছিলেন এবং ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজি (বিচারক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘আর-রিহলা’ ইসলামি ইতিহাস ও ভূগোল গবেষণার অন্যতম মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

মরক্কোতে কি অন্য মাজহাব আছে?

যদিও মরক্কোর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম মালিকি মাজহাব অনুসরণ করেন, তবে দেশটিতে বসবাসরত অল্পসংখ্যক বিদেশি মুসলিম ও কিছু অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে হানাফি, শাফেয়ি কিংবা হাম্বলি মাজহাবের অনুসারীও রয়েছেন। তবে রাষ্ট্রের সরকারি ধর্মীয় শিক্ষা, সরকারি ফতোয়া প্রদান এবং বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি মালিকি ফিকহ।

সংক্ষেপে বলা যায়, মরক্কোর অধিকাংশ মুসলিম মালিকি মাজহাব অনুসরণ করেন। আকিদার ক্ষেত্রে তারা প্রধানত আশআরি মতবাদ এবং আধ্যাত্মিক চর্চায় জুনায়েদি ধারার অনুসারী। এই তিনটি ভিত্তির সমন্বয়ই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মরক্কোর ইসলামি পরিচয়, শিক্ষা ব্যবস্থা ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে গড়ে তুলেছে। আজও এই ঐতিহ্য দেশটির ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তথ্যসূত্র: মরক্কোর সংবিধান (২০১১), আল-মুওয়াত্তা, আল-মুদাওয়ানাহ আল-কুবরা, আশ-শিফা, ইউনেস্কো, মরক্কোর আওকাফ মন্ত্রণালয়, আর-রিহলা