ধর্ম ডেস্ক
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
নীলনদ বিধৌত প্রাচীন জনপদ মিসর। মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে যেমন দেশটির পরিচিতি রয়েছে, তেমনি কোরআন, হাদিস ও ইসলামি ইতিহাসেও এর গুরুত্ব অসামান্য। স্থানীয়ভাবে মিসরকে বলা হয় ‘উম্মুদ দুনিয়া’ (أم الدنيا) বা ‘পৃথিবীর মা’। মুসলমানদের কাছে এই ভূখণ্ডের বিশেষ মর্যাদার কারণ নবী-রাসুলদের স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস, কোরআনে এর উল্লেখ, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুসংবাদ এবং ইসলামি জ্ঞানচর্চায় এর অনন্য অবদান।
পবিত্র কোরআনে একাধিক স্থানে ‘মিসর’ (مصر) শব্দটি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বহু আয়াতে দেশটিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করো।’ (সুরা ইউসুফ: ৯৯)
কোরআনের বর্ণনায় মিসরকে একটি নিরাপদ, উর্বর ও সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোরআনে সরাসরি নাম উল্লেখ হওয়া অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে মিসর অন্যতম।
মিসরের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন। আল্লাহ তাআলার দেওয়া জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি মিসরের অর্থ ও খাদ্যব্যবস্থার দায়িত্ব লাভ করেন। তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকে দেশটি রক্ষা পায়। পরবর্তীতে তাঁর আহ্বানেই হজরত ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর পরিবার মিসরে চলে আসেন, যা বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
অন্যদিকে হজরত মুসা (আ.)-এর দাওয়াত, ফেরাউনের জুলুম, আল্লাহর নির্দেশে সাগরের পানি বিভক্ত হয়ে বনি ইসরাইলের মুক্তি লাভ- এসব ঘটনাও মিসরকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে। সিনাই উপদ্বীপের তূর পাহাড় সেই স্মৃতির সাক্ষী, যেখানে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁকে তাওরাত দান করেছেন।
আরও পড়ুন: মিসরের ইতিহাসে ২ ইউসুফ: একজন নবী, অন্যজন জেরুজালেমের মুক্তিদাতা
মিসর সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের আগেই সুসংবাদ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি দেশটির মানুষের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশও দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘শীঘ্রই তোমরা এমন একটি ভূখণ্ড (মিসর) বিজয় লাভ করবে, সেখানে কিরাতের (দিরহাম বা দিনারের অংশবিশেষ) প্রচলন আছে। তোমর সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে, সদাচরণ করবে। কেননা তোমাদের উপর তাদের প্রতি আছে জিম্মাদারী এবং আত্মীয়তা।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৪৩)
আলেমরা বলেন, এখানে ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক’ বলতে মূলত হজরত হাজেরা (আ.) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী মারিয়া কিবতিয়া (রা.)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। হজরত হাজেরা (আ.) ছিলেন হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মা। আর হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর থেকেই পরবর্তীতে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (স.)-এর আগমন ঘটে। এ দিক থেকেও মিসরের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সম্পর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে ২০ হিজরিতে (৬৪১ খ্রিস্টাব্দ) মিসর বিজিত হয়। এর মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। বিজয়ের পর তিনি আফ্রিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত মসজিদে আমর ইবনুল আস প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
১২৫৮ সালে মঙ্গোলরা বাগদাদ ধ্বংস করার পর মুসলিম বিশ্বের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। এমন সংকটময় সময়ে ১২৬০ সালে বর্তমান ফিলিস্তিনের আইন জালুত প্রান্তরে মিসরের মামলুক বাহিনী সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ ও সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্সের নেতৃত্বে মঙ্গোলদের প্রথম বড় পরাজয় উপহার দেয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিজয় মুসলিম বিশ্বের অবশিষ্ট অঞ্চল এবং ইসলামি সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।
আরও পড়ুন: মরক্কোর ১২টি ইসলামি ঐতিহ্য, যা জানলে আপনিও মুগ্ধ হবেন
ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে মিসরের সবচেয়ে বড় অবদান আল-আজহার। ৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক হাজার বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
মিসরের রাজধানী কায়রোকে অনেকে ‘হাজার মিনারের শহর’ বলে থাকেন। শত শত ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদরাসা ও ইসলামি স্থাপত্যের কারণে এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
মিসরে জন্মগ্রহণ করেছেন কিংবা এটিকে কর্মভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন—এমন বহু বিশ্বখ্যাত আলেম ইসলামি জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম শাফেয়ি (রহ.), ইমাম লাইস ইবনে সাদ (রহ.), ইমাম জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি (রহ.) এবং হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.)। আধুনিক যুগেও বিশ্বখ্যাত ক্বারি, মুফাসসির ও গবেষকদের মাধ্যমে মিসর তার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
মিসর কেবল পিরামিড, নীল নদ বা প্রাচীন সভ্যতার দেশ নয়। এটি এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে নবী-রাসুলদের স্মৃতি, কোরআনের বর্ণনা, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুসংবাদ, সাহাবিদের বিজয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। এ কারণেই মুসলমানদের কাছে মিসর ইতিহাস, ঈমান, জ্ঞান ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক।
তথ্যসূত্র: সুরা ইউসুফ; সুরা কাসাস; সুরা বাকারা; সহিহ মুসলিম; সুনানে আবু দাউদ; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; তারিখুল খুলাফা; নির্ভরযোগ্য ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থসমূহ