Dhaka Mail Logo

ইসলাম

ভুয়া খবর শেয়ারের আগে এই আয়াতটি একবার স্মরণ করুন

ধর্ম ডেস্ক

০৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি খবর মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু সব খবরই সত্য নয়। যাচাই না করে কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করলে তা মানুষের সম্মানহানি, বিভ্রান্তি এমনকি বড় ধরনের ফিতনার কারণ হতে পারে। তাই ইসলাম কোনো সংবাদ বিশ্বাস বা প্রচার করার আগে তা যাচাই করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

কোরআনের চিরন্তন মূলনীতি

যাচাই না করে সংবাদ প্রচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- 
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ جَآءَکُمۡ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوۡۤا اَنۡ تُصِیۡبُوۡا قَوۡمًۢا بِجَہَالَۃٍ فَتُصۡبِحُوۡا عَلٰی مَا فَعَلۡتُمۡ نٰدِمِیۡنَ
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে, পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা হুজরাত: ৬)

এই আয়াত নাজিল হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপটে, যখন ভুল সংবাদের ভিত্তিতে একটি গোত্রের বিরুদ্ধে প্রায় অন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যাচ্ছিল। তবে এর নির্দেশনা কেবল সেই একক ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি যেকোনো তথ্য গ্রহণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতার একটি স্থায়ী নীতি প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো খবর যাচাই না করে শেয়ার করা এই কোরআনিক নির্দেশনার পরিপন্থী।

আরও পড়ুন: যেসব মিথ্যাকে আমরা তুচ্ছ ভাবি, অথচ নবীজির রয়েছে কঠিন হুঁশিয়ারি

যাচাই না করে প্রচারকারীর জন্য কঠোর সতর্কবার্তা

রাসুলুল্লাহ (স.) যাচাই-বাছাইহীন তথ্য প্রচারের অভ্যাসকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে সতর্ক করেছেন। 
তিনি বলেন- ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে, তা-ই (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৫)

দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া মিথ্যার ভয়াবহ পরিণতি

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভুয়া খবর মুহূর্তেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়ে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ স্বপ্নের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক ব্যক্তির বর্ণনা দিয়েছেন, যার মুখের এক পাশ চিরে মাথার পেছন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পরে তাঁকে জানানো হয়, সে এমন ব্যক্তি, যে একটি মিথ্যা কথা প্রচার করত, যা দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত। (সহিহ বুখারি: ৭০৪৭)

ডিজিটাল যুগে একটি ভুয়া খবর মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই যাচাই না করে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই হাদিসের সতর্কবার্তা আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

আরও পড়ুন: গুজব ও অপপ্রচার রোধে ইসলামি নির্দেশনা

একটি ভুয়া খবর যখন চলমান পাপের কারণ

আপনার শেয়ার করা একটি ভুয়া খবর যদি আরও অনেক মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার মাধ্যমে সংঘটিত গুনাহের অংশ আপনার ওপরও বর্তাতে পারে। 
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ রীতি বা মন্দ কাজের প্রচলন করে, সে নিজের গুনাহ এবং যারা তার পরে তা অনুসরণ করবে তাদের গুনাহের অংশও বহন করবে; এতে তাদের গুনাহের কোনো ঘাটতি হবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৭)

বান্দার হক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা

ভুয়া খবরের মাধ্যমে অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্মানহানি করা হয়। এটি বান্দার অধিকার (হক্কুল ইবাদ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। ফিকহের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিত গুনাহে শুধু তওবা করাই যথেষ্ট নয়; বরং যথাসম্ভব ভুল তথ্য সংশোধন করা, যার সম্মানহানি হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাও জরুরি। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ফতোয়ার জন্য স্থানীয় আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

শেয়ার করার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন

১. খবরটির কোনো নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত উৎস আছে কি?
২. এটি শেয়ার করলে কারো সম্মানহানি বা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে কি?
৩. খবরটি যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে কেয়ামতের দিন এর জবাবদিহি করার জন্য আমি প্রস্তুত কি?

মনে রাখতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘শেয়ার’ বাটনে চাপ দেওয়ার আগে একজন মুমিনের প্রথম দায়িত্ব হলো- সংবাদটি সত্য কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো কোনো সংবাদ প্রচারের আগে তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করা। আপনার একটি অসতর্ক শেয়ার মানুষের সম্মানহানি, সমাজে বিভ্রান্তি এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কারণ হতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা শুধু নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্বও।

তথ্যসূত্র: সুরা হুজরাত: ৬; সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা: ৫; সহিহ বুখারি: ৭০৪৭; সহিহ মুসলিম: ১০১৭