ধর্ম ডেস্ক
১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
বাবা-মা দুনিয়াতে যেমন সন্তানের ছায়া হয়ে থাকেন, তেমনি মৃত্যুর পর সন্তানের দোয়া তাঁদের জন্য রহমতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে জানতে চান, জুমার দিনে বিশেষভাবে মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করার কোনো আলাদা ফজিলত আছে কি না। শরিয়তের দলিল ঘেঁটে দেখা যাক, এ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থান কী।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা ইসলামের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নির্দেশনা, যেকোনো দিনেই করা যায়। আল্লাহ তাআলা কোরআনে মুমিনদের শিখিয়েছেন- ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং বিশ্বাসে আমাদের অগ্রগামী ভাইদেরকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা হাশর: ১০)
আর পিতা-মাতার জন্য বিশেষ দোয়া শেখানো হয়েছে এভাবে- রব্বিরহামহুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগিরা ‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ২৪)
হাদিসেও সন্তানের দোয়ার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তিনটি ব্যতীত- সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, আর নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)
আরও পড়ুন: জুমার দিনের এক ঘণ্টা: যে সময়ের দোয়া ফেরত যায় না
জুমার দিনে দোয়া কবুলের একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে বলে হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- فِيهِ سَاعَةٌ لا يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ وَهُوَ يُصَلِّى يَسْأَلُ اللهَ شَيْئًا إِلا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ ‘জুমার দিন এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি এ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তাহলে তিনি তাকে অবশ্যই তা দান করেন। (সহিহ বুখারি: ৯৩৫)
এই মুহূর্তটি কখন- এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত থাকলেও অধিকাংশের মতে এটি আছরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে।
এখানে স্পষ্ট থাকা জরুরি যে এটি কোনো পৃথক বা নতুন বিধান নয়। বিষয়টি দুটি প্রতিষ্ঠিত আমলের সমন্বয়মাত্র: মৃতদের জন্য দোয়া করা সবসময়ই সওয়াবের কাজ, আর জুমার দিন দোয়া কবুলের সম্ভাবনাময় একটি সময়।
তাই উত্তম সময়ে উত্তম আমল করার সুযোগ হিসেবে জুমার দিনে বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা স্বাভাবিকভাবেই অধিক ফজিলতপূর্ণ একটি আমল, যদিও এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট পৃথক হাদিস নেই।
মৃত ব্যক্তি কবরে নিজে কোনো নতুন আমল করতে পারেন না, কিন্তু সন্তানের দোয়ার মাধ্যমে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আল্লাহ জান্নাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন; বান্দা জিজ্ঞেস করবে, ‘এটা কীভাবে হলো?’ তখন বলা হবে, ‘তোমার সন্তানের ইস্তেগফারের কারণে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৬৬০, মুসনাদে আহমদ)
এ থেকে বোঝা যায়, জুমার বরকতময় সময়ে বাবা-মায়ের জন্য ইস্তেগফার করা তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
আরও পড়ুন: মৃত মা-বাবার জন্য কোরআনে বর্ণিত তিন দোয়া
কোনো কোনো লেখায় দাবি করা হয়, প্রতি জুমায় বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করলে বিশেষ ক্ষমা লাভ হয় এবং সন্তান নেককার হিসেবে গণ্য হয়- এই মর্মে ইমাম বায়হাকি (রহ.) বর্ণিত একটি হাদিস উদ্ধৃত করা হয় (শুআবুল ঈমান)।
সততার সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, মুহাদ্দিসগণের মতে এই বর্ণনার সনদ দুর্বল (জঈফ)। তাই এই একক বর্ণনার ভিত্তিতে ‘জুমার দিনেই কবর জিয়ারত করতে হবে’ এমন নির্দিষ্ট বিধান বলা সঠিক নয়।
তবে কবর জিয়ারত ও মৃতদের জন্য দোয়া করা সাধারণভাবে সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত একটি মোস্তাহাব আমল, যা যেকোনো দিন করা যায়, জুমার দিন তার ব্যতিক্রম নয়; বরং এটি একটি উত্তম সুযোগ মাত্র।
জুমার দিনের ফজিলতকে কাজে লাগিয়ে মৃত বাবা-মায়ের জন্য আছরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে দোয়া করা যেতে পারে। সুযোগ থাকলে কবর জিয়ারত করে কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া করা যেতে পারে। তাঁদের নামে দান-সদকা করাও সুন্দর আমলগুলোর একটি। এসব মূল্যবান ও সহজলভ্য আমল, যা তাঁদের কবরের জীবনে রহমত ও বরকতের কারণ হতে পারে।