ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরের ঐতিহাসিক ও পবিত্র ইব্রাহিমি মসজিদের পরিকল্পনা ও নির্মাণসংক্রান্ত ক্ষমতা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে ইসরায়েল। গত মঙ্গলবার এক ঘোষণায় দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ জানান, তিনি ১৯৯৭ সালের হেব্রন চুক্তির সেই অংশগুলো বাতিল করেছেন, যা হেব্রন শহরের ফিলিস্তিনি পৌর কর্তৃপক্ষকে এইচ-২ অঞ্চলে পরিকল্পনা, জোনিং ও নির্মাণকাজের ক্ষমতা দিয়েছিল।
পর্যবেক্ষকরা এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক ক্রিস ডয়েল বলেন, হেব্রন বহু বছর ধরে পশ্চিম তীরের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ শহর, আর এই বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব জোরদার করার যেকোনো পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম তিন ধর্মের অনুসারীরাই বিশ্বাস করেন, হেব্রনের পুরোনো শহরে অবস্থিত এই স্থানে হজরত ইবরাহিম (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.) ও তাঁদের স্ত্রীদের সমাধি রয়েছে। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে এটি ‘টুম্ব অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’ নামে পরিচিত। মুসলমানরা চতুর্দশ শতাব্দীতে রোমান রাজা হেরোদের নির্মিত প্রথম শতাব্দীর বহির্দেয়াল সম্প্রসারিত করে এখানে ইব্রাহিমি মসজিদ গড়ে তোলেন।
হেব্রন ও ইব্রাহিমি মসজিদ বহুবার সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। ১৯৯৪ সালে এক মার্কিন-ইসরায়েলি ইহুদি বসতি স্থাপনকারী এই মসজিদে নামাজরত অবস্থায় ২৯ জন মুসলিমকে হত্যা করে এবং আরও ১২৫ জনকে আহত করে।
সোমবার রাতে স্মোট্রিচ ধর্মীয় স্থান ও পার্শ্ববর্তী ইহুদি বসতির পরিকল্পনা ও নির্মাণক্ষমতা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তরের অনুমোদন দেন। হেব্রনের কাছে একটি নতুন ইসরায়েলি বসতি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে পশ্চিম তীরে ‘ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব’ আরও গভীর হবে; যে অঞ্চলকে ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের কেন্দ্র হিসেবে দেখে।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের ‘ফাঁসির’ আইন, বিশ্বজুড়ে নিন্দা
শহরের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকার ওপর এই ক্ষমতা গ্রহণের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন এ বছরের শুরুতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জমি কেনা সহজ করতে এবং সেখানে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রয়োগক্ষমতা বাড়াতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ অনুমোদন করেছিল।
স্মোট্রিচ পূর্বে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দ্রুত বসতি সম্প্রসারণে সমর্থন দিয়ে এসেছেন, যার সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বৃদ্ধিও যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, এর বাইরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতেও আরও অনেকে নিহত হয়েছেন।
১৯৯৭ সালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন পিএলও চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের মধ্যে স্বাক্ষরিত হেব্রন চুক্তি অনুযায়ী শহরটি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়- প্রায় ৮০ শতাংশ এইচ-১ অঞ্চল ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি প্রায় ২০ শতাংশ এইচ-২ অঞ্চল ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে, যেখানে ইহুদিদের টুম্ব অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস, সংলগ্ন মুসলিম ইব্রাহিমি মসজিদ এবং পুরোনো শহর অন্তর্ভুক্ত। তবে চুক্তিতে এ-ও বলা ছিল, পুরো শহরের পরিকল্পনা ও নির্মাণ তদারকি করবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ)।
জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো হেব্রনের পুরোনো শহরকে ফিলিস্তিনি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রাচীন এই শহরের যে ২০ শতাংশ অংশ ইসরায়েলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে কয়েকশ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী কয়েক দশ হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে বসবাস করেন।
আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় ৪ ফিলিস্তিনি নিহত
১৯৬৮ সাল থেকে হেব্রনে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। ১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ডের পর ইসরায়েল ধাপে ধাপে পুরোনো শহরের বড় অংশ ও মসজিদ সংলগ্ন এলাকা বন্ধ করে দিয়ে, মসজিদকে মুসলিম মুসল্লি ও কয়েকশ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীর মধ্যে বিভক্ত করে এবং বসতি স্থাপনকারীদের সেখানে নামাজের অধিকার দিয়ে ইব্রাহিমি মসজিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকে।
ফিলিস্তিনি থিংকট্যাংক আল-শাবাকার ফিলিস্তিন নীতি ফেলো ফাতহি নিমের বলেন, ইব্রাহিমি মসজিদ এমনিতেই কার্যত ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে ছিল; প্রবেশাধিকার আগে থেকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং সাময়িক বন্ধও হতো, তাই এই পরিবর্তনে বাস্তব পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হবে বলে তিনি মনে করেন না।
আন্তর্জাতিক সমালোচনা এড়াতে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স-এ (টুইটারে) দাবি করে, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে হেব্রন চুক্তি বাতিল করা হয়নি। মন্ত্রণালয় জানায়, কয়েক মাস আগেই নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা ইহুদি বসতি এলাকা ও পবিত্র স্থান, যার মধ্যে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে পবিত্র এই ধর্মীয় স্থানও রয়েছে সংক্রান্ত পরিকল্পনা ও নির্মাণের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
নিমের বলেন, স্মোট্রিচ মূলত চুক্তির সেই অংশটি বাতিল করতে চাইছেন, যেখানে ধর্মীয় স্থান বা বসতি সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত নির্মাণ অনুমোদন বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে হেব্রন পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা ছিল। নিমেরের ভাষ্যে, হেব্রন চুক্তির অধীনে ফিলিস্তিনি পৌরসভার কারিগরিভাবে আপত্তি জানানো বা বসতি স্থাপনকারীদের পরিকল্পনায় বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল। তিনি একে অসলো চুক্তির পর তৈরি হওয়া যেকোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও সমন্বয়ের ওপর ব্যাপক আক্রমণের অংশ বলে বর্ণনা করেন।
আরও পড়ুন: এবার পশ্চিমতীর ‘দখল’ করতে চায় ইসরায়েল
১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তিই ছিল ফিলিস্তিন-ইসরায়েল প্রথম প্রত্যক্ষ শান্তি চুক্তি, যার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পথ তৈরি করা। এই চুক্তির মাধ্যমেই অস্থায়ী হিসেবে কল্পিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠিত হয় এবং পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি এই তিন এলাকায় ভাগ করা হয়, যা পিএ-র নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নির্ধারণ করে।
নিমের বলেন, স্মোট্রিচের এই সিদ্ধান্তের ফলে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে হেব্রন পৌরসভার ইসরায়েলি আদালতে যাওয়ার আর কোনো পথ থাকছে না। তাঁর ভাষায়, এর মাধ্যমে হেব্রনকেও পশ্চিম তীরের বাকি ‘সি অঞ্চলের’ মতো করে ফেলা হলো, যেখানে ইসরায়েল একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেয় কী নির্মিত হবে আর কী সম্প্রসারিত হবে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি মন্ত্রীরা অসলো চুক্তির যতটা সম্ভব বাতিল করতে চান, যদিও বাস্তবে এই চুক্তির বেশিরভাগ অংশই কখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি- তবু তারা চান না এমন কোনো স্বাক্ষরিত দলিল টিকে থাকুক, যা আদালতে উপস্থাপন করা যেতে পারে, যদিও আদালত সব সময় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে রায় দেয়নি। নিমেরের আশঙ্কা, এটি কেবল শুরু- স্মোট্রিচ পুরো হেব্রন চুক্তি বাতিলের পথে এগোতে পারেন এই পদক্ষেপকে হাতিয়ার করে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কার্যালয় এই ক্ষমতা দখলকে হেব্রনের রাজনৈতিক ও আইনি মর্যাদার ওপর হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
হেব্রনের ফিলিস্তিনি মেয়র ইউসেফ আল-জাবারি স্মোট্রিচের ঘোষণাকে ‘বর্ণবাদী সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর লক্ষ্য হেব্রন পৌরসভাকে তার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা।
নিজে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন জমিতে বসতি স্থাপনকারী স্মোট্রিচ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পশ্চিম তীর সংযুক্তির পক্ষে সোচ্চার, আর তাঁর দলের সমর্থনের বড় অংশ আসে আদর্শগতভাবে অনুপ্রাণিত বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে, যারা পশ্চিম তীরকে নিজেদের ভূমি মনে করে এবং একে বাইবেলীয় নাম ‘জুডিয়া ও সামারিয়া’ বলে অভিহিত করে।
আরও পড়ুন: ফিলিস্তিনি শিশুদের অপহরণ করে হত্যা করছে ইসরায়েল
জাতিসংঘ সংস্থাগুলো ও বেশিরভাগ দেশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিকে অবৈধ মনে করে, কারণ এটি অধিকৃত ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের আচরণ-সংক্রান্ত চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রগঠনের প্রধান বাধা। বর্তমানে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূমিতে সাত লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছেন। ইসরায়েল অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে, এই ভূখণ্ড ‘বিতর্কিত’ এবং সেখানে হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিদের উপস্থিতি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মুসলিম অধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এক বিবৃতিতে ইসরায়েল সরকারের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এই ‘বর্ণবাদী ইসরায়েলি সরকারের’ মসজিদের কর্তৃত্ব দখল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবৈধ দখলদারিত্ব সংহত করা, ফিলিস্তিনি স্বশাসন দুর্বল করা এবং ইসলামের অন্যতম পবিত্রতম স্থানের ঐতিহাসিক মর্যাদা পরিবর্তনের আরেকটি প্রচেষ্টা।
ক্রিস ডয়েল মন্তব্য করেন, প্রকৃতপক্ষে হওয়া উচিত শহরের কেন্দ্র থেকে বসতি প্রত্যাহার করা, হেব্রনের বিভাজন অবসান ঘটিয়ে পুরো শহরকে ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং পবিত্র স্থানগুলোর জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা।
ফিলিস্তিনি বা ইসলামি অন্যান্য পবিত্র স্থানেও নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার বা আইনি মর্যাদায় একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। যেমন জেরুজালেমের পুরোনো শহরে অবস্থিত ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘সমস্যাজনক’ বলে বিবেচিত মুসল্লিদের ঠেকাতে পুনর্নবায়নযোগ্য বহিষ্কারাদেশ ব্যবহার করে। প্রবেশদ্বারগুলোয় নিয়মিত তল্লাশি, আটক, পরিচয়পত্র জব্দ এবং মসজিদ চত্বরের কিছু অংশে প্রবেশে বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়। বারবার মসজিদ বন্ধ রাখা বা মুসল্লিদের ওপর বিধিনিষেধকে ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখানো হয়।
রাষ্ট্রীয় সমর্থন বা আইনি সহায়তাপুষ্ট বসতি স্থাপনকারী সংগঠনগুলোও পুরোনো শহরের ভেতরে ও আশপাশে, পবিত্র স্থানের কাছাকাছি ভবনসহ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিতে কাজ করে যাচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা