ধর্ম ডেস্ক
১৬ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় এলে ফ্রান্সের নাম বারবার আলোচনায় আসে। তবে ইউরোপের এই দেশটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো- এখানে বসবাস করে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী। আর ফ্রান্সে ইসলামের ইতিহাস, মুসলিমদের অবদান ও আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতীক হলো প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ (Grande Mosquée de Paris)।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পঞ্চম অ্যারোন্দিসমঁ (5th arrondissement)-এ অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি মুসলিম সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্মারক, ইসলামি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এবং ফরাসি সমাজে মুসলিম উপস্থিতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদের ইতিহাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে সময় ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মুসলিম সৈন্য ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের অনেকেই প্রাণ উৎসর্গ করেন।
এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে ফরাসি সরকার একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। এরপর ১৯২২ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯২৬ সালে মসজিদটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ দুমের্গ (Gaston Doumergue)। ইতিহাসবিদদের মতে, এই মসজিদ নির্মাণ ছিল ফ্রান্সের হয়ে যুদ্ধ করা মুসলিম সৈন্যদের অবদানের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
আরও পড়ুন: মক্কা-মদিনার পর বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ৫ মসজিদ
প্যারিসের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও গ্র্যান্ড মসজিদ তার স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলীর জন্য সহজেই নজর কাড়ে। এর নকশায় মরক্কোর ঐতিহাসিক কারাওয়িয়্যিন মসজিদ এবং তিউনিসিয়ার জায়তুনা মসজিদের স্থাপত্যধারার প্রভাব স্পষ্ট।
সবুজ টাইলস, জটিল জ্যামিতিক অলংকরণ, খোদাইকৃত দেয়াল, মোজাইক শিল্প এবং ঘোড়ার খুরাকৃতির খিলান মসজিদটির সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়েছে। প্রায় ৩৩ মিটার উঁচু মিনারটি দূর থেকেই চোখে পড়ে।
মসজিদের ভেতরে রয়েছে সুসজ্জিত বাগান, ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণ ও ফোয়ারা, যা ইবাদতকারীদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্যও প্রশান্ত পরিবেশ তৈরি করে।
গ্র্যান্ড মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি ফ্রান্সের মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
এখানে রয়েছে গ্রন্থাগার, শিক্ষা কার্যক্রম, সম্মেলনকক্ষ, ঐতিহ্যবাহী হাম্মাম, চা-কক্ষ এবং রেস্তোরাঁ। বছরজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে রমজান মাসে ইফতার, তারাবিহ ও ইসলামি শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে মসজিদটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদের ভূমিকা নিয়েও ইতিহাসে বিশেষ আলোচনা রয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণা, সাক্ষ্য এবং প্রামাণ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নাৎসি দখলদারত্বের সময় মসজিদের তৎকালীন প্রধান সি কাদ্দুর বেন গাব্রিত (Si Kaddour Benghabrit) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বহু ইহুদিকে আশ্রয় ও সহায়তা করেছিলেন। কিছু গবেষকের মতে, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে মুসলিম পরিচয়ের নথি সংগ্রহেও সহায়তা করা হয়েছিল, যাতে তাঁরা নাৎসি নিপীড়ন থেকে রক্ষা পান।
তবে ঠিক কতজন মানুষ এভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যাটি ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে এখনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মসজিদের মানবিক ভূমিকা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
আরও পড়ুন: মসজিদের আদব: আল্লাহর ঘরে নিষিদ্ধ ১১ কাজ
বর্তমানে প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও একটি জনপ্রিয় গন্তব্য।
ইসলামি স্থাপত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে আগ্রহীদের জন্য এটি প্যারিসের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। আধুনিক নগরজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ ফ্রান্সের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
প্রায় এক শতাব্দী আগে মুসলিম সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে নির্মিত প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ আজও ফ্রান্সে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
এর স্থাপত্য, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ভূমিকা এবং মানবিক অবদান একে শুধু একটি ইবাদগাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; এটি পরিণত হয়েছে ইতিহাস, কৃতজ্ঞতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারকে। আজও এই মসজিদের দেয়াল যেন স্মরণ করিয়ে দেয়- যুদ্ধের ইতিহাস শুধু সংঘাতের নয়; আত্মত্যাগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবিকতার ইতিহাসও।
তথ্যসূত্র: গ্র্যান্ড মসজিদ অব প্যারিস, ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ব্রিটানিকা, ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম