ধর্ম ডেস্ক
১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম
বোরকা-হিজাব মুমিন নারীর পর্দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে শুধু বোরকা বা হিজাব পরলেই পর্দার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায় না। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পর্দা হলো পোশাক, আচরণ, কথাবার্তা, দৃষ্টি ও চলাফেরাসহ সামগ্রিক শালীনতার নাম। এ কারণে অনেক সময় বোরকা-হিজাব পরার পরও কিছু ভুলের কারণে পর্দার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পর্দার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা গোপন রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া।’ (সুরা নূর: ৩১)
তাই এমন বোরকা-হিজাব, যা ঝকঝকে পাথর, ভারী কারুকাজ বা অতিরিক্ত দৃষ্টিকাড়া রঙের কারণে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে, তা পর্দার মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাফসিরবিদরা বলেন, পোশাক এমন হওয়া উচিত নয়, যা নিজেই প্রদর্শনীর বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দুই শ্রেণির জাহান্নামি মানুষ, যাদের আমি এখনো দেখিনি... তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো এমন নারী, যারা পোশাক পরিধান করেও যেন উলঙ্গ।’ (সহিহ মুসলিম)
আলেমরা বলেন, শরীরের গঠন স্পষ্ট হয়ে যায়—এমন আঁটসাঁট বা পাতলা পোশাক এই সতর্কতার অন্তর্ভুক্ত। তাই বোরকা-হিজাব এমন হওয়া উচিত, যা শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখে।
আবু মুসা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী (স.) বলেন- নারীরা যখন সুগন্ধি লাগিয়ে জনসমাজকে এর গন্ধ বিলানোর জন্য তাদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করে, সে তখন এরূপ এরূপ। এ কথা বলে তিনি একটি কঠোর মন্তব্য করেন।’ (আবু দাউদ: ৪১৭৩)
তাই বাইরে যাওয়ার সময় এমন সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত, যা গায়রে মাহরামদের দৃষ্টি বা মনোযোগ আকর্ষণ করে।
আরও পড়ুন: ডিজাইন করা বোরকা ও হিজাব পরিধানের শরয়ি বিধান
বর্তমানে হিজাবের ভেতরে চুল উঁচু করে বাঁধার একটি প্রবণতা দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন নারীদের কথা উল্লেখ করেছেন- দুই শ্রেণির জাহান্নামি মানুষ আছে, যাদের আমি এখনো দেখিনি... তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো এমন নারী, যারা পোশাক পরিধান করেও যেন উলঙ্গ, (পর পুরুষকে) নিজেদের প্রতি আকর্ষণ করবে ও নিজেরাও (পর পুরুষের প্রতি) আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের মতো।’ (সহিহ মুসলিম)
হাদিসের ব্যাখ্যায় অনেক আলেম বলেন, মাথার ওপর চুল অস্বাভাবিকভাবে উঁচু করে এমন আকৃতি তৈরি করা পর্দার সৌন্দর্য ও শালীনতার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
পর্দা শুধু পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কথাবার্তায় কোমলতা অবলম্বন করো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।’ (সুরা আহজাব: ৩২)
অতএব বোরকা-হিজাব পরার পাশাপাশি কথাবার্তা, হাসি-ঠাট্টা, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণেও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।
আরও পড়ুন: বালেগ না হলেও যে বয়সে পর্দা করা জরুরি
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।’ (সুরা নূর: ৩১)
একই আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ‘তারা যেন এমনভাবে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।’ (সুরা নূর: ৩১)
অর্থাৎ পর্দা শুধু শরীর ঢাকার নাম নয়; দৃষ্টি, চলাফেরা ও ব্যক্তিত্বেও শালীনতা প্রকাশ পাওয়া উচিত।
অনেক নারী বাস্তবে বোরকা-হিজাব পরলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সাজসজ্জা, ছবি বা ব্যক্তিগত বিষয় এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা পর্দার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হতে পারে। ইসলাম লজ্জাশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অংশ।’ (সহিহ বুখারি)
তাই বাস্তব জীবনের মতো অনলাইন জগতেও পর্দা ও শালীনতার নীতিমালা মেনে চলা উচিত।
বোরকা-হিজাব পর্দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মমর্যাদা রক্ষা এবং শালীনতা প্রতিষ্ঠা করা। তাই একজন মুসলিম নারীর উচিত শুধু পোশাকে নয়, বরং দৃষ্টি, আচরণ, কথাবার্তা, চলাফেরা ও জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পর্দার চেতনা ধারণ করা। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পর্দা পালন করলে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে পবিত্রতা, নিরাপত্তা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।