ধর্ম ডেস্ক
১১ জুন ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম
ইসলাম মানুষকে সত্যবাদিতা ও স্বচ্ছতার শিক্ষা দেয়, একইসঙ্গে কিছু বিষয় গোপন রাখার নির্দেশনাও দেয়। কারণ জীবনের সব কথা, সব কাজ ও সব অর্জন সবার সামনে প্রকাশ করা সবসময় কল্যাণকর নয়। কিছু ক্ষেত্রে গোপনীয়তা মানুষকে রিয়া, অহংকার, হিংসা, বদনজর ও অনর্থক ফিতনা থেকে রক্ষা করে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এমন ছয়টি বিষয় তুলে ধরা হলো, যা অযথা প্রকাশ না করে গোপন রাখাই উত্তম।
অসহায় ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা অত্যন্ত মহৎ আমল। তবে অনেক ক্ষেত্রে তা গোপনে করা আরও ভালো। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা ভালো। আর যদি তা গোপন রাখো এবং দরিদ্রদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও ভালো।’ (সুরা বাকারা: ২৭১)
গোপনে দান করলে ইখলাস বৃদ্ধি পায় এবং লোকদেখানোর প্রবণতা থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু গুনাহ হয়ে গেলে তা অন্যের কাছে প্রচার করা বা গর্বভরে প্রকাশ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দনীয়। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার সকল উম্মতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। আর নিশ্চয় এ বড়ই অন্যায় যে, কোনো লোক রাতের বেলা অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু সে সকাল হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে, আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার উপর আল্লাহর দেয়া আবরণ খুলে ফেলল।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৬৯)
তাই গুনাহ হয়ে গেলে মানুষের কাছে প্রচার না করে আল্লাহর কাছে তওবা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
আরও পড়ুন: ছোট যে ভুলে ক্ষমা লাভের পথ বন্ধ হয়ে যায়
নফল ইবাদত গোপনে করা অধিক ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (স.) সেই ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন, যিনি এতটাই গোপনে দান করেন যে তার ডান হাত কী ব্যয় করে, বাম হাতও তা জানে না। (সহিহ বুখারি: ১৪২৩)
এই শ্রেণির বান্দারা হাশরের কঠিন দিনে আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন। তাহাজ্জুদ, নফল রোজা, জিকির ও অন্যান্য নফল আমল গোপনে করা ইখলাস ও একনিষ্ঠতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায়।
অন্যের ভুলত্রুটি খুঁজে বেড়ানো বা তা প্রকাশ করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)
অন্যের সম্মান রক্ষা করা একজন প্রকৃত মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আরও পড়ুন: অন্যের দোষ গোপন রাখার ৬ ফজিলত
নেক কাজ করার পর তা প্রচার করার প্রবণতা ইখলাস নষ্ট করে এবং রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ: ৫)
তাই অপ্রয়োজনে নিজের নেক আমল প্রচার না করে আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তবে কাউকে উৎসাহিত করার প্রয়োজনে বা শরিয়তসম্মত কোনো কল্যাণকর উদ্দেশ্যে নেক আমল উল্লেখ করা যেতে পারে।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা, স্বপ্ন ও অর্জন সবার কাছে প্রকাশ করা সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হজরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে স্বপ্নের কথা ভাইদের সামনে প্রকাশ না করতে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে।’ (সুরা ইউসুফ: ৫)
এ আয়াত থেকে আলেমরা শিক্ষা নিয়েছেন যে হিংসা, বদনজর ও অযাচিত বাধা থেকে বাঁচতে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ও অগ্রগতি সীমিত পরিসরে রাখা উত্তম।
ইসলাম মানুষের জীবনে ভারসাম্য, প্রজ্ঞা ও ইখলাসের শিক্ষা দেয়। সব বিষয় প্রকাশ করা যেমন প্রজ্ঞার পরিচয় নয়, তেমনি সবকিছু গোপন রাখাও কাম্য নয়। তবে দান-সদকা, নফল ইবাদত, নিজের গুনাহ, অন্যের দোষত্রুটি ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা অযথা প্রকাশ না করলে মানুষ রিয়া, অহংকার, হিংসা ও নানা অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকতে পারে।
একজন মুমিনের উচিত নিজের আমলকে আল্লাহর জন্য খাঁটি রাখা, অন্যের সম্মান রক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে জীবন পরিচালনা করা। এতে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই কল্যাণ লাভের আশা করা যায়।