images

ইসলাম

সীমান্ত পাহারার বিস্ময়কর ফজিলত: মৃত্যুর পরও বন্ধ হবে না আমল

ধর্ম ডেস্ক

১০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব। এ কারণেই সীমান্ত পাহারা ও জনপদ রক্ষাকে কোরআন-হাদিসে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শত্রুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত থাকাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘রিবাত’ বলা হয়। এ আমলের এমন সব ফজিলতের কথা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যা অন্য অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ।

কোরআনে সীমান্ত রক্ষার নির্দেশ

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো ও ধৈর্যে অটল থাকো এবং পাহারায় নিয়োজিত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে সফল হও।’ (সুরা আলে ইমরান: ২০০)
মুফাসসিররা বলেন, এ আয়াতে মুসলিম জনপদ, রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তার জন্য সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একদিনের সীমান্ত পাহারা দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম

হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- رِبَاطُ يَوْمٍ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا ‘আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি: ২৮৯২)
দুনিয়ার সব সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনা করেও সীমান্ত পাহারার মর্যাদা বোঝানো যায় না- হাদিসটি সে কথাই স্পষ্ট করে।

আরও পড়ুন: তিন মানুষের চোখ জাহান্নামের আগুন দেখবে না

একদিন-একরাত প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ

হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ ‘আল্লাহর পথে একদিন ও একরাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং একমাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯১৩)

মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না সওয়াব

একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন- وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَأَمِنَ الْفَتَّانَ ‘যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তাহলে তার আমলের প্রতিদান চলতে থাকবে, তার জন্য রিজিক অব্যাহত থাকবে এবং সে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯১৩)
সাধারণত মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।

যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (স.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের কদরের রাতের থেকেও শ্রেষ্ঠ রাতের কথা জানাব না? সে ওই পাহারাদারের রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে সে হয়তো তার পরিবারে জীবিত ফিরতে পারবে না।’ (মুসতাদরাক হাকেম: ২৪২৪; সহিহুত তারগিব: ১২৩২)
এ হাদিস সীমান্ত রক্ষাকারীদের আত্মত্যাগ ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অসাধারণ মর্যাদা তুলে ধরে।

আরও পড়ুন: ভারতের পুশইন চেষ্টা, ফের সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা

যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না- এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়, দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৬৩৯)
এ হাদিসে সীমান্ত ও জনপদ পাহারায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রহরায় কাটানো একটি রাতের বিনিময়ে জান্নাত

হুনাইনের যুদ্ধের রাতে পাহারার দায়িত্ব পালন করেন সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.)। তিনি সারা রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে একটি গিরিপথ পাহারা দেন। নামাজ ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া একবারও ঘোড়া থেকে নামেননি। সকালে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, ‘তুমি তোমার জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৫০১)
এ সুসংবাদ তাঁর আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রহরার কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছিল।

জান্নাতের সুসংবাদ যাদের জন্য

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহর পথে প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ২৮৮৭)

আরও পড়ুন: ৮ শ্রেণির মানুষের জন্য জান্নাত ওয়াজিব

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা

বর্তমানে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তার নিয়তে দায়িত্ব পালন করলে তারা এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা একটি মহান ইবাদত। একদিনের প্রহরা দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম, একদিন-একরাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। তাই যারা দেশের নিরাপত্তার জন্য ইসলামি ভূখণ্ড নিরাপদ রাখতে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিঃসন্দেহে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যা ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিত কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে। সীমান্ত পাহারা তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। 

আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের এই মহান খেদমত কবুল করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সুরা আলে ইমরান: ২০০; সহিহ বুখারি: ২৮৮৭, ২৮৯২; সহিহ মুসলিম: ১৯১৩; সুনানে তিরমিজি: ১৬৩৯; সুনানে আবু দাউদ: ২৫০১; মুসতাদরাক হাকেম: ২৪২৪; সহিহুত তারগিব: ১২৩২