images

ইসলাম

মৃত সন্তানের জন্য যেসব আমল করতে পারেন

ধর্ম ডেস্ক

০৯ জুন ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

সন্তান হারানোর বেদনা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। তবে ইসলাম এ পরিস্থিতিতে মুমিনকে ধৈর্য ধারণ, দোয়া এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ দেখিয়েছে। মৃত সন্তানের জন্য মা-বাবার আন্তরিক দোয়া, সদকা ও অন্যান্য কল্যাণমূলক আমল তার জন্য উপকারী হতে পারে এবং একই সঙ্গে মা-বাবার জন্যও সওয়াবের কারণ হতে পারে।

সবর ও আল্লাহর প্রশংসা: ‘বায়তুল হামদ’-এর সুসংবাদ

সন্তান মারা যাওয়ার পর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যখন কোনো মুমিনের সন্তান মারা যায়, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার বান্দা কী বলেছে?’ তারা বলেন, সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়েছে। তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করো এবং তার নাম রাখো বায়তুল হামদ (প্রশংসার ঘর)।’ (সুনানে তিরমিজি: ১০২১)

সন্তানের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার

মৃত সন্তানের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হলো মা-বাবার আন্তরিক দোয়া। আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা, রহমত ও উত্তম পরিণতি কামনা করা উচিত। নবী করিম (স.) মৃত মুসলিমের জন্য এ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন- اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে নিরাপদ রাখুন এবং তাকে মার্জনা করুন।’ (সহিহ মুসলিম)

আরও পড়ুন: সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্য ধারণের মহান প্রতিদান

সন্তানের পক্ষ থেকে দান-সদকা

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা তার জন্য উপকারী। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মনে করি, তিনি কথা বলতে পারলে সদকা করার নির্দেশ দিতেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তাহলে কি তিনি সওয়াব পাবেন? রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম: ১০০৪)

এই হাদিসের আলোকে সন্তানের পক্ষ থেকেও দান-সদকা করা যেতে পারে। যেমন গরিবকে খাবার দেওয়া, পানির ব্যবস্থা করা, মসজিদ বা মাদরাসায় সহযোগিতা করা, কোরআন বিতরণ করা কিংবা এতিমদের সহায়তা করা।

কাজা ইবাদত আদায়

সন্তান যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মারা যায় এবং তার জিম্মায় মানতের রোজা বাকি থাকে, তাহলে অভিভাবক তার পক্ষ থেকে তা আদায় করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মারা গেল অথচ তার জিম্মায় মানতের রোজা বাকি আছে, তার অভিভাবক যেন তার পক্ষ থেকে রোজা রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৫২)

আরও পড়ুন: আকিকার আগে সন্তান মারা গেলে করণীয় কী

একইভাবে, সন্তানের ওপর ফরজ হজ বাকি থাকলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করা যেতে পারে। এক নারী নবী (স.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর মায়ের ওপর হজ ফরজ হয়েছিল কিন্তু তিনি হজ করার আগেই মারা গেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তাঁর পক্ষ থেকে হজ করো।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৫২) এই হাদিসটি সন্তানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ছোট শিশু হলে জান্নাতের সুসংবাদ

বালেগ হওয়ার আগে যেসব শিশু মারা যায়, তাদের ব্যাপারে হাদিসে বিশেষ সুসংবাদ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে মুসলমানের তিনটি সন্তান বালেগ হওয়ার আগে মারা যায়, আল্লাহ তাদের প্রতি রহমত করে তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (সহিহ বুখারি: ১২৪৮)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, এসব শিশু কেয়ামতের দিন তাদের মা-বাবার জন্য সুপারিশ করবে এবং মা-বাবাকে ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে চাইবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

যেসব কাজ থেকে বিরত থাকবেন

সন্তানের মৃত্যুতে উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করা, ভাগ্যকে দোষারোপ করা, কবরকে কেন্দ্র করে শরিয়তবিরোধী অনুষ্ঠান করা, চল্লিশা বা কুলখানির মতো প্রথা পালন করা এবং কুসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত। এসব কাজ মৃত ব্যক্তির কোনো উপকার করে না; বরং সুন্নাহর পরিপন্থী।

সন্তানের বিচ্ছেদ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কষ্টের। কিন্তু একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, দুনিয়ার বিচ্ছেদ চিরস্থায়ী নয়। তাই শোককে হতাশায় পরিণত না করে ধৈর্য ধারণ, দোয়া, দান-সদকা ও নেক আমলে নিজেকে ব্যস্ত রাখাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা মৃত সন্তানদের জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন এবং তাদের মা-বাবাকে ধৈর্য ও উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।