ধর্ম ডেস্ক
২৯ মে ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
মদিনার মসজিদে নববীর সবচেয়ে পবিত্র অংশ হলো রওজা মোবারক; যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এবং তাঁর দুই প্রিয় সহচর হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)। হজ ও ওমরায় যাওয়া অনেক মুসলমানের মনে প্রশ্ন জাগে- রওজার চারপাশে ধাতব জালি থাকলেও সেখানে কোনো দরজা বা জানালা কেন নেই?
এই স্থানটি মূলত ছিল উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর ছোট একটি কক্ষ, যাকে আরবিতে ‘হুজরা’ বলা হয়। নবীজি (স.)-এর ওফাতের পর দাফনের স্থান নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে আবু বকর (রা.) নবীজির হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন- ‘কোনো নবীকেই পৃথিবী থেকে ওঠানো হয়নি তাঁকে সেই স্থানে দাফন করা ছাড়া যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।’ এরপর আবু তালহা (রা.) নবীজির বিছানা সরিয়ে নিলে সেখানেই বগলি কবর খনন করা হয়।
পরে ১৩ হিজরিতে আবু বকর (রা.) এবং ২৪ হিজরিতে ওমর (রা.) ইন্তেকাল করলে তাঁদেরও নবীজির পাশে দাফন করা হয়। তিন কবর পরস্পরের খুব নিকটবর্তী। মহানবী (স.)-এর বুক বরাবর আবু বকর (রা.) এবং তাঁর বুক বরাবর ওমর (রা.) শায়িত। তিনজনের মাথা মসজিদে নববীর দিকে, পা জান্নাতুল বাকির দিকে এবং চেহারা কেবলার দিকে।
নবীজি (স.)-এর ইন্তেকালের পরও আয়েশা (রা.) আমৃত্যু নিজ কক্ষে বসবাস করেন। ওমর (রা.)-এর দাফনের পর ঘরের অবশিষ্ট জায়গায় কাপড় টানিয়ে তিনি থাকতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর হুজরায় প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: নবীজির রওজা জেয়ারতে যেসব আদব মানবেন
রওজার অবকাঠামোতে বিভিন্ন যুগে পরিবর্তন এসেছে। প্রথম পরিবর্তন আসে ১৭ হিজরিতে- হজরত ওমর (রা.) হুজরার খেজুরগাছের দেয়াল সরিয়ে পাকা দেয়াল নির্মাণ করেন।
এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনুল আবদুল আজিজ (রহ.) ৮৮-৯১ হিজরিতে। তিনি কালো পাথরের একটি স্থায়ী দেয়াল নির্মাণ করেন এবং দুটি বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা নেন। প্রথমত, দেয়ালটি যেন কাবা শরিফের মতো চার কোণা না হয় সেজন্য এটি পঞ্চকোণবিশিষ্ট করা হয়, যাতে কেউ তওয়াফ করতে না পারে। দ্বিতীয়ত, কক্ষটি সম্পূর্ণ দরজাহীন রাখা হয়।
৫৫৭ হিজরিতে সুলতান নুরুদ্দিন আদিল আশ-শহীদ হুজরার চারপাশে গভীর পরিখা খনন করে তাতে গলানো সিসা ঢেলে দেন, যাতে কেউ কখনো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পবিত্র দেহ মোবারকের কাছে পৌঁছাতে না পারে।
৬৬৮ হিজরিতে সুলতান রোকনুদ্দিন জাহির বাইবার্স রওজার চারপাশে কাঠের কাঠামো নির্মাণ করেন। পরে ৮৮৭ হিজরিতে সুলতান কায়িতবা তামা ও লোহার জালি দিয়ে এটিকে বর্তমান রূপ দেন; এটিই ‘মাকসুরা’ নামে পরিচিত। মাকসুরায় চারটি দরজা রয়েছে: দক্ষিণে বাবুত তাওবা, উত্তরে বাবুত তাহাজ্জুদ, পূর্বে বাবুল ফাতেমা এবং পশ্চিমে বাবুন নাবি (বাবুল উফুদ নামেও পরিচিত)। বিশিষ্ট মেহমানরা বাবুল ফাতেমা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।
আরও পড়ুন: মদিনায় হাজিদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল
৬৭৮ হিজরিতে সুলতান মুহাম্মাদ ইবন কালাউনের আমলে রওজার ওপর প্রথম গম্বুজ নির্মিত হয়। ৮৮৬ হিজরিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ৮৮৭ হিজরিতে সুলতান কায়িতবা এটি পুনর্নির্মাণ করেন। ১২৩৩ হিজরিতে সুলতান মাহমুদ ইবন আবদুল হামিদ গম্বুজটি আবার নতুন করে নির্মাণ করেন; সেই গম্বুজ আজও টিকে আছে। ১২৫৩ হিজরিতে উসমানি সুলতান আবদুল হামিদ এটি সবুজ রং করার নির্দেশ দেন, তখন থেকেই এটি ‘সবুজ গম্বুজ’ নামে পরিচিত। বর্তমান কাঠামোটি ১৯১৭ সালে উসমানীয় গভর্নর ফাখরি পাশা সংস্কার করেন।
রওজা মোবারকে দরজা-জানালা না থাকার পেছনে রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ইতিহাস- নবীজির পবিত্রতা রক্ষা, আকিদাগত সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার বহুস্তরীয় ব্যবস্থা। ওমর ইবনুল আবদুল আজিজ থেকে নুরুদ্দিন জঙ্গি পর্যন্ত প্রতিটি যুগের মুসলিম শাসকরা এই পবিত্র স্থানকে সুরক্ষিত রাখতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
তথ্যসূত্র: রওজা পাকের ইতিকথা; রাসুলের রওজা; সৌদিপিডিয়া; ইসলাম কিউএ