ধর্ম ডেস্ক
২২ মে ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘মানুষের মধ্যে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা অবশ্যকর্তব্য।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)
হজে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাও অপরিহার্য। তবে জীবনের বাস্তবতায় অনেক মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছান, যখন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই মহান ইবাদতের সফরে যাওয়া সম্ভব হয় না। ইসলামি শরিয়ত মানুষের এই সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়েছে। সেই সহজতার অন্যতম নিদর্শন হলো ‘বদলি হজ’ বা ‘হজে বদল’।
ফিকহের পরিভাষায়, অক্ষম ব্যক্তির পক্ষ থেকে অন্য কাউকে দিয়ে ফরজ হজ আদায় করানোকে বদলি হজ বলা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মাওলানা আনিসুজ্জামান শিকদারের ভাষায়- জীবিত অবস্থায় কেউ যদি নিশ্চিত হন যে তিনি আর হজে যেতে পারবেন না, অথবা মৃত্যুর আগে এ বিষয়ে অসিয়ত করে যান, তাহলে তার পক্ষ থেকে যে হজ আদায় করা হবে সেটিই বদলি হজ।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, বিদায় হজের সময় এক নারী রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এসে বললেন- ‘বৃদ্ধ অবস্থায় আমার পিতার উপর আল্লাহর পক্ষ হতে এমন সময় হজ ফরজ হয়েছে, যখন তিনি সওয়ারির উপর বসে থাকতে পারছেন না। আমি কি তার পক্ষ হতে হজ আদায় করতে পারি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৫৫)
আরেক হাদিসে জুহাইনা গোত্রের এক নারী বললেন- ‘আমার মা হজের মান্নত করেছিলেন, কিন্তু তা আদায়ের আগেই মারা গেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ করব?’ রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘তার পক্ষ থেকে হজ করো ...আল্লাহর ঋণ আদায় করাই অধিক উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৫২)
ফিকহবিদরা বলেন, এসব হাদিস প্রমাণ করে- বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্যের পক্ষ থেকে হজ আদায় বৈধ।
আরও পড়ুন: হজযাত্রায় মৃত্যু হলে কেয়ামত পর্যন্ত হজের সওয়াব
১. স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা
যদি কোনো ব্যক্তি এমন অসুস্থতায় আক্রান্ত হন, যেখান থেকে সুস্থ হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নেই, তাহলে তিনি বদলি হজ করাতে পারবেন। যেমন: চরম বার্ধক্য, পক্ষাঘাতগ্রস্ততা, দুরারোগ্য ব্যাধি বা চলাফেরায় স্থায়ী অক্ষমতা। তবে সাময়িক অসুস্থতার ক্ষেত্রে বদলি হজ যথেষ্ট নয়- সুস্থ হওয়ার আশা থাকলে নিজেকেই হজ আদায় করতে হবে। (আল-হিদায়া: ১/২৯৬)
২. হজ ফরজ হওয়ার পর মৃত্যু
কোনো ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হয়েছিল কিন্তু আদায়ের আগেই তিনি মারা গেছেন—এমন ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করা বৈধ। তিনি যদি অসিয়ত করে যান, তাহলে তার পরিত্যক্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে বদলি হজের ব্যবস্থা করা ওয়ারিসদের দায়িত্ব। অসিয়ত না থাকলেও ওয়ারিসরা চাইলে তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করাতে পারেন এবং আলেমরা এটিকে উত্তম কাজ বলেছেন। (সহিহ মুসলিম)
৩. মান্নতের হজ আদায় না করে মৃত্যু
কেউ যদি হজের মান্নত করেন কিন্তু তা আদায়ের আগেই মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে তার পক্ষ থেকেও বদলি হজ করা যাবে। এ বিষয়ে সহিহ হাদিস বিদ্যমান।
৪. কারাবন্দি বা অবরুদ্ধ ব্যক্তি
যদি কেউ এমন দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, যেখান থেকে মুক্ত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নেই এবং তার ওপর হজ ফরজ হয়ে থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করানো যেতে পারে। সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে আলেমদের মতে, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিও ওজরগ্রস্ত হিসেবে গণ্য হবেন।
৫. নারীর মাহরাম না থাকা
কিছু ফকিহের মতে, কোনো নারীর ওপর হজ ফরজ হলেও যদি তার সঙ্গে যাওয়ার মতো মাহরাম না থাকে এবং ভবিষ্যতেও পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে তিনি বদলি হজের ব্যবস্থা করতে পারেন। তবে এ বিষয়ে মাজহাবভেদে মতপার্থক্য রয়েছে।
আরও পড়ুন: ভিড়ের মধ্যে নারীরা তাওয়াফ ও সাঈ করবেন যেভাবে
রাসুলুল্লাহ (স.) এক ব্যক্তিকে ‘শুবরুমার’ (ভাই/বন্ধু) পক্ষ থেকে হজ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি নিজের হজ করেছ?’ সে বলল, ‘না।’ তখন তিনি বললেন- ‘আগে নিজের হজ করো, এরপর শুবরুমার পক্ষ থেকে করো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৮১১)
এই হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ আলেম বলেন, নিজের ফরজ হজ আদায় করেছেন এমন ব্যক্তিকে দিয়েই বদলি হজ করানো উত্তম। এছাড়া বদলি হজ পালনকারীকে হজের মাসয়ালা ও নিয়মাবলি সম্পর্কে অবগত, মুসলমান, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে। উল্লেখ্য, নারীর পক্ষ থেকে পুরুষ বা পুরুষের পক্ষ থেকে নারী উভয়ই বদলি হজ আদায় করতে পারেন।
নিয়ত স্পষ্ট হওয়া: ইহরামের সময় নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজের নিয়ত করতে হবে। মুখে উচ্চারণ করা উত্তম- ‘আমি অমুকের পক্ষ থেকে হজের ইহরাম করছি।’
প্রেরকের নির্দেশনা মানা: প্রেরক যদি নির্দিষ্টভাবে ইফরাদ, কিরান বা তামাত্তু হজের নির্দেশ দেন, সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করতে হবে। নির্দেশনা না থাকলে ‘ইফরাদ’ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ব্যয়ভার প্রেরকের: হজের যাবতীয় খরচ যার পক্ষ থেকে হজ করা হবে তার সম্পদ থেকেই বহন করতে হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মূলব্যক্তি অর্থ প্রদানের সময় তা ‘হজের খরচ’ হিসেবে দেবেন- ‘হাদিয়া’ হিসেবে নয়। কারণ প্রেরিত ব্যক্তি টাকার মালিক হয়ে গেলে সেই হজ তার নিজের হজ হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত: হজের খরচ শেষে অতিরিক্ত অর্থ বেঁচে গেলে তা মূল ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়া উচিত।
বদলি হজ ব্যবসা নয়: আলেমরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, বদলি হজকে উপার্জনের মাধ্যম বানানো উচিত নয়। প্রতিনিধি প্রয়োজনীয় যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ নিতে পারবেন, কিন্তু একে বাণিজ্যিক চুক্তিতে পরিণত করা শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।
আরও পড়ুন: হজের সফরে ধৈর্যের গুরুত্ব
যদি কেউ অক্ষমতা বা কারাবন্দি অবস্থার কারণে বদলি হজ করিয়ে নেন, এরপর সুস্থ হয়ে যান বা মুক্তি পেয়ে সক্ষম হন, তাহলে পূর্বের বদলি হজ নফল হিসেবে গণ্য হবে। তাকে পুনরায় নিজের ফরজ হজ নিজেকেই আদায় করতে হবে।
অনেকেই দুটিকে এক মনে করেন, অথচ মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ঈসালে সওয়াবের হজে কেউ নিজের খরচে নফল হজ আদায় করে তার সওয়াব অন্য কাউকে উপহার দেন, এতে নিজের হজও আদায় হয়। কিন্তু বদলি হজ কেবল ওই ব্যক্তির ফরজ হজ হিসেবেই গণ্য হবে, যার পক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে।
যেমন হজের বদলি বৈধ, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতিতে ওমরার বদলিও বৈধ। হাদিসে বৃদ্ধ বা অক্ষম ব্যক্তির পক্ষ থেকে ওমরা করার অনুমতি পাওয়া যায়। (জামে তিরমিজি: ৯৩০)
বদলি হজ দয়া, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার অনন্য উদাহরণ। সন্তান যখন মৃত পিতামাতার পক্ষ থেকে হজ আদায় করে, তখন তা একদিকে ইবাদত, অন্যদিকে ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালনের বহিঃপ্রকাশ। তবে এটি কেবল বিশেষ অবস্থার জন্যই প্রযোজ্য। সামর্থ্যবান ব্যক্তির মূল দায়িত্ব হলো নিজে গিয়ে হজ আদায় করা।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি, আল-হিদায়া, ইগাসাতুল লাহফান (ইবনুল কাইয়িম), মাসিক আল-কাউসার।